আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যে প্রতিযোগিতামূলক সময়ের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই সে কথা বলে দেয়। মানসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাব এর জন্য মূলত দায়ী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে প্রতি তিনজন বেকারের একজন উচ্চশিক্ষিত (স্নাতক বা স্নাতকোত্তর)। অর্থাৎ স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা আট লাখ ৮৫ হাজার। শিক্ষার এই করুণ হারের মধ্যে আরেকটি হতাশাজনক খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক না পড়ে শিক্ষাজীবনের ইতি টেনেছেন।

মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর উচ্চমাধ্যমিকে ঝরে পড়া এবং ফর্ম পূরণ করেও প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ না নেয়া নিছক একটি তথ্য নয়; দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতার দগদগে ক্ষত। এর মানে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিশ্চিত করাই শিক্ষার সাফল্য নয়; শিক্ষার্থীকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।

মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের পর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী নানা কারণে শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারছেন না। দারিদ্র্য, অল্প বয়সে পারিবারিক দায়িত্ব পালন, বাল্যবিয়ে, কর্মসংস্থানের চাপ, শিক্ষার ব্যয় বৃৃৃৃৃদ্ধি এবং মানসম্মত শিক্ষা ও পরামর্শের অভাব অনেককে মাঝপথে শিক্ষা ছাড়তে বাধ্য করছে। গ্রামাঞ্চলে এই সঙ্কট আরো প্রকট। ফলে বহু শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থেমে যাচ্ছে উচ্চশিক্ষার দোরগোড়ায়।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলোÑ ফর্ম পূরণের পরও প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ না নেয়া। এর পেছনে আছে মানসিক চাপ, পরীক্ষাভীতি, দুর্বল অ্যাকাডেমিক প্রস্তুতি, আর্থিক সঙ্কট কিংবা পারিবারিক ও সামাজিক নানা প্রতিকূলতা। ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

লক্ষণীয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু অবকাঠামোগত নয়, নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও বিদ্যমান রয়েছে। শিক্ষা এখনো আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য, দক্ষতা বিকাশ এবং ব্যক্তিগত চাহিদার পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। ফলে দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীরা খুব সহজে ধীরে ধীরে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছেন।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানো। নিয়মিত কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ছাত্রছাত্রীদের শনাক্ত করে তাদের বিশেষ সহায়তা দেয়া। সেই সাথে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত কর্মসূচি হাতে নেয়া। একই সাথে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিক্ষাকে আরো বাস্তবমুখী ও আকর্ষণীয় করে তোলা। যাতে করে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষে সহজে পছন্দনীয় পেশা নির্বাচন করতে পারেন। এটি নিশ্চিত করা গেলে বাবা-মা যেকোনো মূল্যে সন্তানের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখবেন।

একটি দেশের উন্নয়ন তার মানবসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তাই লাখো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যাওয়া কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের জন্যও বড় বাধা। এটি রোধে দ্রুততম সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ঝরে পড়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরো বড় আর্থসামাজিক সঙ্কট ডেকে আনবে। সঙ্গতকারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় ধরে রাখা এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।