বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে জটিল নিরাপত্তা অবস্থানে রেখেছে। স্থলসীমান্ত পুরোটাজুড়ে ঘিরে আছে আগ্রাসি শক্তি। জলসীমানায়ও ঘেরাও হয়ে আছি প্রায় একই ধরনের শত্রুতার আবহে। নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব¡কে প্রতিনিয়ত হুমকি মোকাবেলা করে এগোতে হয়। এমন নাজুক অবস্থা থাকার পরও দেশের প্রতিরক্ষা উদ্যোগ গুরুত্ব পায়নি। গড়ে ওঠেনি দেশের টেকসই নিরাপত্তা অবকাঠামো। জুলাই বিপ্লবের পরও প্রতিরক্ষা অবকাঠামো যে আলাদা গুরুত্ব পায়নি, তা বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে। সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা না করা গেলে একটি দেশের অস্তিত্ব মূল্যহীন হয়ে পড়ে; এটি জাতীয় নেতৃত্বকে বুঝতে হবে।

বাংলাদেশের ভঙ্গুর নিরাপত্তার বিপরীতে প্রতিরক্ষায় কতটা নজর আছে, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর এ খাতে বাজেট বরাদ্দের সাথে তুলনা করলে বোঝা যায়। সর্বশেষ বাজেটে প্রতিরক্ষা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এটি জিডিপির শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ। পাকিস্তানে যা ২ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি, ভারতে ২ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি। বিগত বছরগুলোতে দেশ দু’টি প্রতিরক্ষায় এই হারে ব্যয় করেছে। দেশ দু’টি পরমাণুধর। প্রতিনিয়ত সামরিক আধিপত্য নিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। এ জন্য দেশ দু’টির প্রতিরক্ষা বাজেট বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানের চেয়েও আমাদের প্রতিরক্ষা বাজেট তুলনামূলক কম। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশের নিরাপত্তা হুমকি আমাদের মতো উচ্চ নয়। দেশগুলোর সীমান্তে শত্রুদের আগ্রাসন মোকাবেলা করতে হয় না।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে বেসামরিক নিরাপত্তা অবকাঠামো ও বাহিনীর পেছনে বিপুল ব্যয় বাড়িয়েছে। বাজেটে এই খাতে এবারো ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দুর্ভাগ্য হচ্ছে- আমাদের বেসামরিক নিরাপত্তাবাহিনীর পেছনে বিপুল ব্যয় করে দেশের মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, গুপ্ত কারাগার সৃষ্টি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে এদের বিরুদ্ধে। অথচ আমাদের দরকার সীমান্ত সুরক্ষা। যেখান থেকে অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার হুমকি আসছে প্রতিনিয়ত। প্রতিরক্ষা বাজেটের মূল অংশ মূলত বেতনভাতাসহ দৈনন্দিন খরচে ব্যবহৃত হবে। আমাদের প্রয়োজন উন্নততর সামরিক প্রযুক্তি। যে কারণে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব চ্যালেঞ্জে। বিশেষ করে ছোট দেশগুলোর যেভাবে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হচ্ছে সমকালীন বিশ্বে।

সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে বিজিবি হিমশিম খাচ্ছে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সামরিক সরঞ্জাম না থাকায় এই বেহাল দশা। এখন এমন সরঞ্জাম দরকার, যা দিয়ে স্থলসীমান্ত, আকাশ প্রতিরক্ষা ও নৌসীমানা সহজে সুরক্ষিত রাখা যাবে। ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ নামে সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের কর্মসূচি আমাদের আছে। এটি সফল করতে হলে অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিরক্ষা বাজেট সময়োপযোগী করতে হবে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিরাপত্তা অবকাঠামো ধাপে ধাপে বাড়াতে হবে।

আমাদের পূর্ব সীমান্তে মিয়ানমার বারবার আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। একইভাবে অবৈধ পুশইনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে ভারত। আমাদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির দুর্বলতা বারবার প্রকাশিত হয়েছে। শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা থাকলে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।

দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য। আমাদের নীতিনির্ধারকদের এ নিয়ে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।