জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব খেলাপি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। সংসদে উল্লিখিত ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের ১০টিই আর্থিক খাতের দুর্বৃত্ত এস আলম গ্রুপের। গত সোমবার কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে তিন হাজার ৩৩০ কোটি আট লাখ টাকা খেলাপি ঋণ। তবে আদালতের নির্দেশনায় তিন হাজার ৩৩০ কোটি আট লাখ টাকা বর্তমানে নিয়মিত বা অ-খেলাপি হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে। অর্থাৎ- আইনি মারপ্যাঁচে বিপুল এই অর্থ খেলাপি তালিকার অন্তর্ভুক্ত দেখানো সম্ভব হচ্ছে না।

দেশের ব্যাংক খাতে শীর্ষ ঋণখেলাপিদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আজ আর শুধু আর্থিক সমস্যা নয়; বরং গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক সঙ্কটের রূপ নিয়েছে। যখন কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিপুল ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করেও বছরের পর বছর পার পেয়ে যায়, তখন প্রশ্ন জাগে, এ ব্যবস্থার জবাবদিহি কোথায়?

স্মরণযোগ্য যে, ঋণখেলাপি হওয়া সবসময় ইচ্ছাকৃত নয়। ব্যবসায়িক ঝুঁকি, বাজার পরিস্থিতি বা অনাকাক্সিক্ষত সঙ্কট অনেক সময় ঋণ পরিশোধে বাধার সৃষ্টি করে। কিন্তু শীর্ষ ঋণখেলাপিদের বেলায় প্রায়ই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং আইনি জটিলতার সুযোগে তারা ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ কিংবা দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নেন। ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হন। অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। কারণ, বিপুল অনাদায়ী ঋণ ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় করে। এতে নতুন ঋণ বিতরণে সঙ্কোচন আসে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা যারা অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। সেই সাথে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি মোকাবেলায় সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। যা সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে নিরুৎসাহিত করে। উদ্বেগজনক হলো, যখন বড় ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যান, তখন অন্যদের মধ্যেও ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতা বাড়ে। এতে একটি নৈতিক অবক্ষয় ঘটে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এমন পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাই ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে।

খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধানে দরকার কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ। ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা আরো স্বচ্ছ ও কঠোর করা জরুরি, যাতে প্রভাবশালীরা এর অপব্যবহার করতে না পারেন। এক্ষেত্রে ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করার বিকল্প নেই। এ ছাড়া ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

আমরা মনে করি, শীর্ষ ঋণখেলাপিদের শুধু তালিকা প্রকাশ নয়; তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতির স্থিতিশীলতা কেবল নীতিমালার ওপর নয়, ন্যায়বিচারের ওপরও নির্ভর করে। যদি শীর্ষ ঋণখেলাপিরা আইনের ঊর্ধ্বে থেকে যায়, তবে সেই অর্থনীতি কখনো টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারবে না। এখনই সময় দৃঢ় অবস্থান নেয়ার, নইলে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়ে অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয় নিয়ে আসবে।