আজ মঙ্গলবার ভারতে সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দিল্লি সফরের সময় তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে বৈঠক করবেন। বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস-বিষয়ক মন্ত্রীর সাথেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এটি বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রীর প্রথম দিল্লি সফর।
নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানে ভারতের পছন্দের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ও পলায়ন থেকে তারেক রহমানের সরকার গঠন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বহু ঘটনা ঘটেছে; এলোমেলো অনেক বাতাস বয়ে গেছে পুবে-পশ্চিমে। বহু পানি গড়িয়েছে অভিন্ন নদীতে। সব পানি স্বচ্ছ ও পঙ্কমুক্ত ছিল না। তাতে মিশে ছিল বাংলাদেশের জন্ম থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত এ দেশের মানুষের প্রতি ভারতের আচরণের বৈসাদৃশ্যজনিত আবিলতা; বিশেষ করে শেখ হাসিনার ১৫ বছরে বাংলাদেশকে কার্যত ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত করার ঘটনা চরম তিক্ততার জন্ম দেয়।
বিএনপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারত লোকসভার স্পিকারকে পাঠিয়েছিল। সেটি ছিল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত। এ পরিপ্রেক্ষিত সামনে রেখে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বর্তমান দিল্লি সফর। এতে ঢাকা বুঝতে চাইবে দিল্লি দুই দেশের সম্পর্ক কিভাবে এগিয়ে নিতে চায়। তেমনি বাংলাদেশ বিশেষ করে বিএনপি সরকার ভারতকে কতটা আস্থায় নিচ্ছে সেটি বুঝতে চাইবে দিল্লি।
সফরে যাওয়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই।
মন্ত্রীর উক্তি আন্তর্জাতিক রীতিনীতির কথা। প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্কের আন্তর্জাতিক আইন-কানুন এবং রীতিনীতি আছে। দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সুসম্পর্কের কথা বলা হয়। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে কেউ আপস করেন না। নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব বলে আন্তঃরাষ্ট্রেীয় সম্পর্কের বেলায় কিছু নেই।
শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশের একমাত্র বন্ধু ছিল ভারত। নিঃস্বার্থভাবে ভারতের স্বার্থ দেখছিল আওয়ামী লীগ সরকার। কারণটা সবার জানা। কিন্তু হাসিনার সৃষ্ট আবিলতা এ সফরে কতটা কাটবে দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশের মানুষ। আদানি গোষ্ঠীর সাথে অসম বিদ্যুৎচুক্তি, ট্রানজিট-করিডোর, সীমান্তবাণিজ্য, নদীর পানির একতরফা প্রত্যাহার চুপচাপ মেনে নেয়া; সীমান্তে একের পর এক গুলি করে বাংলাদেশীদের হত্যা, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে মুস্তাফিজকে নিয়ে বৈষম্যমূলক আচরণÑ সবই বাংলাদেশের মানুষ মনে রেখেছেন। মনে রেখেছেন তিস্তার পানিবঞ্চনা। নিপীড়ক খুনি হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি ও অসংখ্য নেতাকর্মী এখনো ভারতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও কার্যকর করতে হলে এসব বিষয় এড়ানোর সুযোগ নেই।
এটি স্পষ্ট যে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বর্তমান সফরে ভারত বুঝতে চাইবেÑ হাসিনার সময়ে পাওয়া সুবিধাগুলো ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে কি না। পেলে কতটা।
প্রতিবেশীদের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি কারো অজানা নয়। কারো সাথে দেশটির সুসম্পর্ক নেই। ঢাকার সাথে দিল্লির অভিন্ন স্বার্থ আছে বটে। তবে ভারতের অন্য অনেক প্রতিবেশীর মতো নয় বাংলাদেশ। ঢাকার আছে ভিন্ন পরিচয়। সেটি ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য। মুসলিমপ্রধান দেশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রশ্নে দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা নয়। বিষয়টি বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে ভারতের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে।