সারা বিশ্বে কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির প্রায় সব দেশ যন্ত্র ব্যবহারে অভাবনীয় উন্নতি ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষির ওপর ভর করে টিকে আছে। এখনো শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশের বেশি কৃষিতে নিয়োজিত। অথচ সামগ্রিক অর্থনীতিতে কৃষির অবদান ২০ শতাংশের বেশি নয়। আমাদের কৃষিতে সেভাবে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। এতে যন্ত্রের ব্যবহারও সেভাবে বাড়েনি। এর পেছনে সরকারের গাফিলতি, নীতি প্রাধান্য না পাওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতিরও সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বিগত দেড় দশকের বেশি সময়ে কৃষিকেও লুটপাটের ক্ষেত্র বানানো হয়।

নয়া দিগন্তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিগত সরকারের সময়ে কৃষির জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় বড় একটি প্রকল্পে কিভাবে দুর্নীতি হয়েছে তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে পুরনো চক্র আবারো কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের বড় ধরনের প্রকল্প প্রণয়নের পথে হাঁটছে। ‘সমন্বিত কৃষি যান্ত্রীকরণ’ নামের প্রকল্পটি নেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। এতে ব্যয় ধরা হয় তিন হাজার ২০ কোটি টাকা। এর লক্ষ্য ছিল কৃষিতে শ্রম সঙ্কট নিরসন। তদন্তে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ৮৫০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ক্রয়ের বিপরীতে একাধিকবার বিল উত্তোলন করা হয়। আরো ৯৭১টি যন্ত্রে ভর্তুকি নেয়া হয়। বাস্তবে এ যন্ত্রগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় সামনে আসায় প্রকল্পটি ঝুলে যায়। এর সাথে জড়িত বিগত সরকারের কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক সচিব ওয়াহিদা আক্তারসহ চক্রের আরো কয়েকজন সদস্যের নাম এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ ও বিচারের ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার উদ্যোগ নেই। অথচ স্পষ্ট প্রমাণ আছে নির্ধারিত যন্ত্র সরবরাহ না করে বিল তারা তুলে নিয়েছেন।

একই ধরনের বড় প্রকল্প সামনে আনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এবার তিন হাজার ৬৯০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছেন। এর সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। এবার ১০ হাজার কম্বাইন্ড হারভেস্টার, তিন হাজার রাইস ট্রান্সপ্লান্টার এবং তিন হাজার রিপার বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাড়তি হিসেবে নতুন প্রকল্পে কৃষিতে ড্রোন-প্রযুক্তি ব্যবহার, উন্নত সেচ প্রচলন ও আরো কিছু অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

নতুন প্রকল্পটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এ কারণে যে, আগের প্রকল্পের দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। একইভাবে ওই প্রকল্পের কেনাকাটার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও তদন্ত ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেই। আশঙ্কা রয়েছে, পুরনো চক্রের অনেকে আবারো নতুন প্রকল্পে যুক্ত হতে পারেন। ফের হতে পারে বড় ধরনের দুর্নীতি। ফলে কৃষকরা এ প্রকল্প থেকে কাক্সিক্ষত সুফল পাবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রচলনে এ ধরনের সরকারি প্রকল্প প্রয়োজনীয়। সরকারের কোষাগার থেকে উচ্চ ব্যয়ে চালিত এ প্রকল্পের স্বচ্ছতা দরকার। নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে পুরনো প্রকল্পে দুর্নীতির বিচার হতে হবে। এ ছাড়া নতুন প্রকল্পে সত্যিকার অর্থে কৃষকরা উপকৃত হবেন, তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।