আবু সাঈদ খান
উপমহাদেশের সংখ্যালঘু রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলে একটি লক্ষণীয় বৈপরীত্য চোখে পড়ে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার, নিরাপত্তা কিংবা ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে ভারত সরকার, ভারতের রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় সংগঠন প্রায়ই প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়, কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানায় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিষয়গুলো উত্থাপন করে। ফলে বাস্তবে বা মনস্তাত্ত্বিকভাবে- যেভাবেই দেখা হোক না কেন, এই সম্প্রদায়ের একটি অংশ নিজেদের পেছনে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন অনুভব করে।

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় সংখ্যায় সংখ্যালঘু হলেও বিভিন্ন অধিকার, দাবিদাওয়া ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাদের বহু ব্যক্তি ও সংগঠন সক্রিয়ভাবে মতামত প্রকাশ করে। তারা সরকার, প্রশাসন কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনাও করে থাকে। গণতান্ত্রিক সমাজে এটি নাগরিক অধিকারের অংশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমনকি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধেও তাদের কেউ কেউ কথা বলে। এই প্রকাশ্য অবস্থানের পেছনে ভারতের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক শক্তি হিসেবে কাজ করে।

অন্য দিকে ভারতের মুসলিমরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, গণপিটুনি, উচ্ছেদ, ঘৃণামূলক বক্তব্য, উপাসনালয়কে ঘিরে উত্তেজনা এবং বিভিন্ন বৈষম্যমূলক নীতির অভিযোগ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে; কিন্তু এসব ঘটনার পরও ভারতের মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ অত্যন্ত সতর্ক ও সংযত অবস্থান গ্রহণ করে। রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে নিজেদের দেশপ্রেম, সাংবিধানিক আনুগত্য এবং জাতীয় পরিচয় বারবার প্রমাণ করার- এক অদৃশ্য চাপের মধ্যে বসবাস করতে হয়।

এই পার্থক্যের পেছনে কয়েকটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ উপমহাদেশের মুসলিম সমাজকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভক্ত করে দেয়। পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও ভারতের একটি বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী বাস্তব কারণে সেখানেই থেকে যায়। দেশভাগের পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ছিল নিজস্ব রাষ্ট্র গঠন ও নিরাপত্তা; ফলে ভারতের মুসলিমদের প্রশ্নটি ধীরে ধীরে তাদের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্র থেকে সরে যায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও একই প্রবণতা বহাল থাকে।

দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তান- কোনো রাষ্ট্রই ভারতের মুসলিমদের অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ধারাবাহিক, সুস্পষ্ট ও উচ্চকণ্ঠ কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেনি। মাঝে মধ্যে উদ্বেগ বা বিবৃতি এলেও তা ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের হিন্দু সম্প্রদায়কে ঘিরে যে ধরনের নিয়মিত ও প্রকাশ্য অবস্থান দেখা যায়, তার সমপর্যায়ের নয়।

তৃতীয়ত, ভারতের রাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবেশী দেশগুলোর হিন্দু সম্প্রদায়কে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত পরিসরের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে। ফলে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে হিন্দুদের নিয়ে যেকোনো ঘটনাকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিপরীতে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো সাধারণভাবে ভারতের মুসলিমদের বিষয়কে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে প্রকাশ্য কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলে। কেউ কোনো বিবৃতি দিলেও ভারত বরাবর তাদের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে প্রদত্ত বিবৃতিকে প্রত্যাখ্যান করার রীতি চর্চা করে আসছে।

ফলে বাস্তবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের হিন্দুরা অন্তত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থনের প্রত্যাশা করতে পারে; কিন্তু ভারতের প্রায় ২০ কোটিরও বেশি মুসলিমের পেছনে এমন কোনো মুসলিম রাষ্ট্রকে ধারাবাহিকভাবে দাঁড়াতে দেখা যায় না। এই বাস্তবতা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক মনস্তত্ত্ব এবং আত্মপ্রকাশের ধরনেও প্রভাব ফেলেছে বলে অনেক বিশ্লেষকের অভিমত।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, কোনো রাষ্ট্রের উচিত অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযথা হস্তক্ষেপ করা; বরং প্রশ্নটি হলো- যখন মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু নিরাপত্তার বিষয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়, তখন একই নীতির প্রয়োগ কি সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে হচ্ছে? নাকি ভূরাজনীতি, কৌশলগত স্বার্থ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য অনুযায়ী এই নীতিগুলোর প্রয়োগে দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করছে?

উপমহাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং প্রকৃত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বার্থে এই প্রশ্নগুলোর সৎ, নিরপেক্ষ ও নীতিনিষ্ঠ পর্যালোচনা প্রয়োজন। সংখ্যালঘুদের অধিকার কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়; এটি একটি সর্বজনীন মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। একই মানদণ্ডে সব রাষ্ট্র ও সব সম্প্রদায়ের অধিকারকে মূল্যায়ন করাই একটি ন্যায়ভিত্তিক আঞ্চলিক ব্যবস্থার পূর্বশর্ত।

লেখক : আহ্বায়ক, কুরআন পাঠ আন্দোলন