নরওয়ের স্বপ্নযাত্রায় বাধা ইংল্যান্ড চ্যালেঞ্জ

Printed Edition
khela-1
মিয়ামি সিএফ স্টেডিয়ামে প্রশিক্ষণের সময় সতীর্থদের সাথে নরওয়ের আর্লিং হলান্ড ও আন্তোনিও নুসা (বাঁয়ে), কানসাস সিটির সোপ সকার ভিলেজে প্রশিক্ষণের সময় ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন ও মার্কাস রাশফোর্ড : ইন্টারনেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ইউরোপীয় ফুটবলের দুই ভিন্ন ধাঁচের দলের লড়াই। সেমিফাইনালে উঠার লড়াইয়ে আজ ১৯৬৬ আসরের সোনালি ট্রফি জয়ী ইংল্যান্ডের সামনে নরওয়ে। এর আগে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সে হওয়া বিশ্বকাপে রাউন্ড অব সিক্সটিনে খেলেছিল আর্লিং হলান্ডের দলটি। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে এবার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নিজেদের ইতিহাসকে আরো সমৃদ্ধ করেছে নরওয়েজিয়ানরা। নরওয়ের আক্রমণভাগে রয়েছে গতি, শারীরিক শক্তি ও গোল করার অসাধারণ দক্ষতা। ইংল্যান্ডের স্কোয়াডে রয়েছে অভিজ্ঞতা, গভীরতা ও ট্যাকটিক্যাল শৃঙ্খলা। তাই ম্যাচটি হতে পারে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে শেষ চারে উঠার লড়াইয়ে নামবে দুই দল।

বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে বিবেচিত ইংল্যান্ড। গোলরক্ষক থেকে শুরু করে রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণ- প্রতিটি বিভাগেই রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার। দলটি সাধারণত বলের দখল ধরে রেখে ধৈর্যের সাথে আক্রমণ গড়ে তোলে। পাশাপাশি দ্রুত উইং প্লে এবং বক্সের ভেতরে কার্যকর ফিনিশিং তাদের বড় শক্তি।

বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মেক্সিকোকে এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর কঠিন লড়াইয়ে ৩-২ গোলের জয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছিল ইংল্যান্ড। টমাস টুখেলের দল সেদিন ৩৬ মিনিট একজন কম নিয়ে খেলেও জুড বেলিংহামের জোড়া ও হ্যারি কেনের গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে। ওই ম্যাচে জোড়া গোলদাতা জুড বেলিংহাম, পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ হ্যারি কেন, বিশালদেহী ড্যান বার্নদের দৃঢ়তায় ১০ জনের থ্রি লায়ন্সরা ১১তম বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে।

টানা তিন ম্যাচ জয়ের ধারা নিয়ে ফ্লোরিডায় এখন ইংল্যান্ড। এই প্রতিটি জয়েই তারা অন্তত দু’টি করে গোল করেছে এবং সব মিলে তাদের শেষ সাত ম্যাচের মধ্যে ছয়টিতেই জয় পেয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ঘানার সাথে গোলশূন্য ড্র। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বমঞ্চে মহাদেশীয় ম্যাচগুলোই ইংল্যান্ডের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। থ্রি লায়ন্সরা শেষ ছয়টি বিশ্বকাপ নকআউট পর্ব থেকে বিদায়ের পাঁচটিই এসেছে ইউরোপীয় দলগুলোর বিপক্ষে।

যদিও ২০১৪ সালের পর থেকে এই দুই কোয়ার্টার-ফাইনালিস্ট আর মুখোমুখি হয়নি- সেদিন ওয়েন রুনির পেনাল্টি গোলে ইংল্যান্ড একটি প্রীতিম্যাচে ১-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল এবং শেষ চারে আর্জেন্টিনা বা সুইজারল্যান্ডের প্রতিপক্ষ কে হবে, তা পেনাল্টি শুটআউটের মাধ্যমে নির্ধারিত হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

মেক্সিকোর জেসুস গ্যালার্দোকে ট্যাকল করে সরাসরি লাল কার্ড পেয়েছিলেন বায়ার লেভারকুজেনের ডিফেন্ডার জ্যারেল কোয়ানসাহ। ফলে কোয়ার্টার-ফাইনালে তাকে পাবে না ইংল্যান্ড। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে এখনো অনিশ্চিত রিস জেমস। সে ক্ষেত্রে টুখেলের একাদশে ফিরতে পারেন জেড স্পেন্স। এ ছাড়াও বিকল্প হিসেবে আছেন জন স্টোনস ও এজরি কনসার। আজতেকায় বিজ্ঞাপনের হোডিংয়ের সাথে সংঘর্ষে কব্জিতে আঘাত লেগেছিল জর্দান হেন্ডারসনের। এরপর অস্ত্রোপচার করায় বিশ্বকাপের বাকি অংশ থেকে ছিটকে গেছেন তিনি। অনুশীলনে সীমাবদ্ধ ছিলেন মার্ক গেহি ও ডেক্লান রাইস। তবে এই ম্যাচে খেলতে না পারার ঝুঁকিতে নেই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় আছে নরওয়ে। তরুণ ও প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়ে দলটি ধীরে ধীরে ইউরোপের শক্তিশালী দলগুলোর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক, ডান ও বাম প্রান্ত ব্যবহার করে আক্রমণ গড়ে তোলা এবং সেট-পিস থেকে সুযোগ তৈরি করাই দলটির অন্যতম শক্তি।

বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত নরওয়ের একমাত্র পরাজয়টি এসেছিল কোনো ইউরোপীয় দেশের বিপক্ষে। গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলের হার। এরপর আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা এই অপ্রতিরোধ্য রোয়ারদের সামনে কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারেনি। ব্রাজিলকে শেষ ষোলোর ম্যাচে হারানো ম্যাচে একাই দুই গোল করেছিলেন গোলমেশিন হিসেবে পরিচিত আর্লিং হলান্ড। আর পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হারিয়ে অপরাজিত থাকার রেকর্ডটি বজায় রেখে শেষ আটে জায়গা করে নেয় নরওয়ে।

স্টালে সোলবাকেনের দল এখন পর্যন্ত চলমান আসরে পাঁচটি বিশ্বকাপ ম্যাচের প্রতিটিতেই গোল করেছে (মোট ১২টি)। গোল হজম করেছে (৯টি)। তবে বিশ্বকাপে কখনো কোনো ইউরোপীয় দলকে হারাতে পারেনি নরওয়ে। আর ইংল্যান্ডের সাথে তাদের শেষ চারটি সাক্ষাতের কোনোটিতেই গোলও করতে পারেনি। তবে সম্প্রতি দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছে সোলবাকেনের দল। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে শেষ মুহূর্তে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন নরওয়ের লেফট-ব্যাক ডেভিড মোলার উলফ। তবে তিনি সম্পূর্ণ অনুশীলনে ফিরেছেন এবং কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য তাকে নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইয়ে একাদশে পরিবর্তন আনতে পারেন কোচ। কারণ গত ম্যাচে হলান্ডের দুই গোলের জোগানদাতা ছিলেন অস্কার বব ও আন্দ্রেয়াস শেল্ডেরাপ। যার ফলে আলেকজান্ডার সরলোথ ও আন্তোনিও নুসার জায়গা নেয়ার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

টুর্নামেন্টে সাতটি গোল করে এখনো গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা হলান্ড বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তার নেয়া শটের ৩৯ শতাংশ গোলে পরিণত করেছেন। যা ১৯৮৬ সালে গ্যারি লিনেকারের পর টুর্নামেন্টে ১৫টির বেশি শট নেয়া যেকোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে সেরা হার।

এই ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে মাঝমাঠের লড়াই। যে দল মাঝমাঠে আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে, তারাই ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করবে। নরওয়ে যদি দ্রুত বল আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের প্রেসিং এড়িয়ে যেতে পারে, তাহলে তারা গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারবে। অন্য দিকে শুরু থেকেই যদি উচ্চ প্রেসিংয়ে নরওয়েকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখতে পারে ইংল্যান্ড, তাহলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদের হাতেই।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত ১২ বার মুখোমুখি হয়েছে নরওয়ে ও ইংল্যান্ড। এর মধ্যে সাত ম্যাচে জয়ী হয়ে এগিয়ে আছে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপজয়ীরা। অপর দিকে মাত্র দু’টি ম্যাচে জয় পেয়েছে নরওয়ে। বাকি থাকা তিন ম্যাচই হয়েছে ড্র। দুই দলের লড়াইয়ে এই ১২ ম্যাচে ২৮ বার জালে বল পাঠিয়েছে ইংল্যান্ড। অপর দিকে ৯ গোল নরওয়ের। আর সবশেষ মুখোমুখি লড়াইয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রীতিম্যাচে ইংল্যান্ড ১-০ গোলে হারিয়েছিল নরওয়েকে।