বিশ্বকাপ ফুটবল বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরের চরম উত্তেজনা নিয়ে সাধারণ মানুষ উন্মাদনায় আছে, ঠিক সেই সময় দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ ও নীরব সুনামি ধেয়ে আসছে। ফুটবল মাঠের জয়-পরাজয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে আমরা ভুলে যাচ্ছি নিজস্ব বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কথা।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ২০ হাজার পোশাকশ্রমিক তাদের রুটিরুজির একমাত্র সম্বল চাকরিটি হারিয়েছেন। অন্তত ৮৭টি কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর যেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন হওয়ার প্রত্যাশা ছিল, সেখানে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো ও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) দেশের এই বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘নজিরবিহীন ঝুঁকি’ হিসেবে বলছে। তাদের মতে, এখনই যদি অর্থনীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার বা সার্জারি করা না হয়, তবে দেশের সামনে এক গভীর অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।
তৈরী পোশাক কারখানার মালিকরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে আমাদের প্রধান দুই গন্তব্য- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পণ্য কেনার চাহিদা ব্যাপক হারে কমে গেছে। পশ্চিমা বিশ্ব গত কয়েক দশক ধরে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির শিকার হয়েছে, তা মোকাবেলা করতে তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সেখানকার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে এবং তারা পোশাকের মতো বিলাসী বা তুলনামূলক কম জরুরি পণ্যের পেছনে খরচ কমিয়ে দিয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে। নতুন অর্ডারের চরম খরা দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বায়াররা (বিদেশী ক্রেতা) আগের চেয়ে অনেক কম দামে পোশাক কিনতে চাইছেন, যা আমাদের মালিকদের পক্ষে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় বড় কারখানার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে মাঝারি ও ছোট আকারের (SME) সাব-কন্টাক্টিং কারখানাগুলো। মূল কারখানাগুলো যখন অর্ডার পাচ্ছে না, তখন সাব-কন্টাক্টিং কারখানাগুলো কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়েই ঝাঁপ বন্ধ করে দিচ্ছে, আর রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন হাজার হাজার নিরীহ শ্রমিক।
এই বৈশ্বিক মন্দার ওপর ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। ইরান, ইসরাইল এবং আমেরিকার মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ ও লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। এই জলপথটি এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে ছোট ও সাশ্রয়ী পথ; কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলো এখন লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকা মহাদেশের ‘কেপ অব গুড হোপ’ বা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ইউরোপ যাচ্ছে।
এই অতিরিক্ত দূরত্বের কারণে আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ ভাড়া এক ধাক্কায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি লিড টাইম বা পণ্য পৌঁছানোর সময় বেড়ে গেছে ১৫ থেকে ২০ দিন। বৈশ্বিক এই অস্থিরতার কারণে ইউরোপের বড় বড় ক্রেতারা এখন বাংলাদেশ থেকে তৈরী পোশাক নিতে চরম ভয় পাচ্ছেন। কারণ এক দিকে জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধির সঙ্কট, অন্য দিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য ক্রেতাদের হাতে পৌঁছানোর সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো না গেলে সিজন বা মৌসুম পার হয়ে যায়, এতে ওই পোশাকের আর মূল্য থাকে না।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অনেক কারখানায় বিদেশী বায়ারদের পর্যাপ্ত অর্ডার থাকা সত্ত্বেও দেশের ব্যাংকগুলো তাদের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (Back-to-Back LC) বা ঋণপত্র খোলার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে না।
পোশাক খাতের বিপর্যয়ের পেছনে আরেকটি বড় অনুঘটক- তীব্র জ্বালানি সঙ্কট। পোশাক কারখানার বয়লার, ডায়িং ও ওয়াশিং প্ল্যান্টগুলো চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস জরুরি; কিন্তু ডলার সঙ্কটের কারণে সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পর্যাপ্ত এলএনজি (LNG) বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে পারছে না। ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে (গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ) গ্যাসের তীব্র হাহাকার চলছে। দিনে ১২-১৪ ঘণ্টাই কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ (Pressure) থাকছে না। জেনারেটর চালাতে গিয়ে ব্যয়বহুল ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচকে আকাশচুম্বী করে তুলছে। অনেক কারখানা শুধু গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবেই তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। উৎপাদন কমলে আয় কমে, আর আয় কমলেই ছাঁটাইয়ের খড়গ নেমে আসে শ্রমিকের ঘাড়ে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ডলারের রিজার্ভ কাগজে-কলমে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার দেখানো হলেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) বিপিএম৬ (BPM6) মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য বা নিট রিজার্ভের (Net Reserve) প্রকৃত পরিমাণ মাত্র ৩০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি (বা তারও নিচে)। এই সীমিত পরিমাণ অর্থ দিয়ে বড়জোর তিন থেকে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি সঙ্কেত।
দেশের রিজার্ভের এমন নড়বড়ে অবস্থার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও (FDI) এখন বাংলাদেশে নতুন কোনো পুঁজি বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। গত চার বছরের ব্যবধানে ডলারের অফিসিয়াল দাম ৮৫ টাকা থেকে এক লাফে ১২০ টাকার উপরে চলে গেছে, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি বা টাকার অবমূল্যায়ন। ডলারের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কলকারখানার তুলা, সুতা, কেমিক্যাল ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানির খরচও সমানুপাতিক হারে বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদিত চূড়ান্ত পণ্যের দাম বাজারে এসে আরো বেশি হারে বাড়ছে। এ দিকে ডলারের মজুদ ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এই কড়াকড়িতে দেশের ভারী ও মাঝারি শিল্পকারখানার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে। দুর্বল হচ্ছে অর্থনীতি। অর্থনীতি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আর দেশ বাঁচলে তবেই আমরা উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারব।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com