৯ জুলাই, ২০২৬ দেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। ওই রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর বিষয়ে দেয়া হাইকোর্টের রায় বহাল রাখা হয়েছে। স্মরণযোগ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন জাতীয় সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে, যার আওতায় সংবিধানের ৫৪টি ক্ষেত্রে সংশোধন, বিয়োজন, পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা হয়। এরূপ সংশোধনীর সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা। সংবিধানের মূলনীতি বাতিল করে ১৯৭২ সালের নীতিগুলো ফেরত আনা। শেখ মুজিবকে জাতির পিতা ঘোষণা করা। সংবিধানের কতগুলো অনুচ্ছেদ সংশোধনে গণভোটের বিধান বাতিল করা। সংবিধানের ৭ক ও ৭খ-অনুচ্ছেদের আওতায় কয়েকটি অনুচ্ছেদকে অপরিবর্তনীয় করা এবং তা পরিবর্তনের উদ্যোগকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর এসব পরিবর্তনের বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। ওই বছরের শেষ দিকে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ নাগরিক হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। পরে একই বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ আরো কয়েকজন পৃথক রিট দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর এক ঐতিহাসিক রায় দেন। আদালত পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেন। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল এবং সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে কয়েকটি পক্ষ আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করে। তার পরিপ্রেক্ষিতে টানা কয়েক দিনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ সব আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। এর মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক বিতর্কের কয়েকটি বিষয়ের আইনি ফয়সালা হয়ে গেল।

তবে আদালতের রায়ের মাধ্যমে পঞ্চদশ সংশোধনীর ৫৪টি বিষয়ের মধ্যে চারটির নিষ্পত্তি হলেও, ৫০টি বিষয়ে আদালত জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দিয়েছেন। এর ফলে সংসদ দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার তথা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন যে, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর তা পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হবে। এ জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করা হবে। তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বসাধারণ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা হবে। পাবলিক কনসালটেশনের মাধ্যমে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করা হবে।’

আইনমন্ত্রী আদালতের রায়ের পর পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল-পরবর্তী সংবিধান সংস্কারের যে সম্ভাব্য উদ্যোগের কথা বলেছেন, তাতে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর উল্লেখ করেননি। এর ফলে এটা ধারণা হওয়া স্বাভাবিক, আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছেন; তার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণভোট ২০২৬-এর মধ্য দিয়ে জুলাই সনদের যে সাংবিধানিক সংস্কারের জনরায় প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে সমন্বয় সাধনের ব্যাপারে সরকারি সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটেনি। বিএনপি সরকার জাতীয় নির্বাচনের পরে জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। ফলে তারা গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছেন।

জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কারের যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিধান আছে তার কয়েকটি পুনরুল্লেখ প্রয়োজন মনে করছি :

বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬(২) এ বর্ণিত ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিকরা বাংলাদেশী বলে পরিচিত হবেন’ বিধানটি নিম্নোক্তভাবে প্রতিস্থাপন করা হবে : ‘বাংলাদেশের নাগরিকরা ‘বাংলাদেশী’ বলে পরিচিত হবেন’।

সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ সুনির্দিষ্ট কতগুলো অনুচ্ছেদ যেমন ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, যেটি ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ, ৫৮ঙ অনুচ্ছেদ হিসেবে সংবিধানে যুক্ত হবে তা সংশোধনে গণভোটের প্রয়োজন হবে।

সংবিধানবিষয়ক অপরাধ ও সংবিধান সংশোধনের সীমাবদ্ধতা বিষয়ক বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক এবং ৭খ বিলুপ্ত করা হবে।

সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, গণতন্ত্র, সামাজিক সুবিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ উল্লেখ থাকবে।

সংবিধানে যুক্ত করা হবে যে, ‘বাংলাদেশ একটি বহু-জাতি, বহু-ধর্মী, বহু-ভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ; যেখানে সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে’।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) সংশোধনীর প্রস্তাব করে কারো পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়া নিজ এখতিয়ারবলে রাষ্ট্রপতি নিম্নলিখিত পদে নিয়োগ প্রদান করতে পারবেন : ১. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ২. এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, ৩. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, ৪. তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, ৫. বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, ৬. আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ।

একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যতবার হোক সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকতে পারবেন, এ জন্য সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদসমূহের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সাথে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন না, এরূপ বিধান সংবিধানে যুক্ত করা হবে।

মেয়াদ অবসানের ক্ষেত্রে সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ৩০ দিন পূর্বে আইনসভার নিম্নকক্ষের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে এবং সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায়- ১. প্রধানমন্ত্রী, ২. বিরোধীদলীয় নেতা, ৩. স্পিকার, ৪. ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) এবং ৫. সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি- মোট পাঁচ (৫) সদস্য সমন্বয়ে একটি ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি’ গঠিত হবে। কমিটির যেকোনো বৈঠক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সভাপতিত্ব করবেন স্পিকার। (এ প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত সুপারিশ আছে)

সংবিধানে যুক্ত করা হবে যে, ‘(ক) বাংলাদেশে একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকবে, যার নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) এবং উচ্চকক্ষ (সিনেট) ১০০ (একশত) সদস্য নিয়ে নিয়ে গঠিত হবে’। নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের ১০০ (একশত) জন সদস্য নির্বাচিত হবেন।

সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করবেন। ২. আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগদান করবেন।

সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন (জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন-জেএসি) গঠন করা হবে’।

রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে, তবে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে প্রধান বিচারপতি সময়ে সময়ে, যে সার্কিট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন তার পরিবর্তে রাজধানীতে সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকবে এবং প্রধান বিচারপতি কর্তৃক প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক স্থায়ী বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

নির্বাচন কমিশন, ন্যায়পাল, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের জন্য সরকারি ও বিরোধী দল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ইত্যাদি সমন্বয়ে বাছাই কমিটির গঠনের বিস্তারিত পৃথক সুপারিশ করা হয়।

জুলাই সনদে বড় দাগে মোট ৪৮টি সাংবিধানিক সংস্কারের সিদ্ধান্ত আছে। ওদিকে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলে আরো ৫০টি ছোট-বড়সহ ৯৮টি সংশোধনী নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের কাজ করতে হবে।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চ পর্যায়ের সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করা হবে; সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সর্বসাধারণ তথা অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে তো জুলাই জাতীয় সনদে সব রাজনৈতিক দল ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তার প্রতি জনগণ রায়ও দিয়েছেন। সংবিধান সংস্কার কমিটি জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে বলে গণভোটে জনগণ রায় দিয়েছেন। সুতরাং আবার নতুন করে সংবিধান সংস্কার কমিটি কেন গঠন করা হবে? এর মধ্য দিয়ে সরকার কি এই বার্তা দিচ্ছে না যে, তারা জাতীয় জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় উপেক্ষা করছেন। প্রকারান্তরে জাতির কাছে দেয়া অঙ্গীকার ভঙ্গ করছেন? আমরা আশা করব, সরকারের সুমতি হবে। জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সর্বসম্মতভাবে টেকসই সংবিধান সংস্কারের আন্তরিক পদক্ষেপ নেবে।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব

ayubmiah@gmail.com