হিংসা-বিদ্বেষ বড় দোষ। ব্যক্তি, পরিবার কিংবা সমাজের পাশাপাশি যখন রাজনীতিতেও এই দোষের চর্চা হয়, তখন সর্বক্ষেত্রে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। অতীতে দেশে আওয়ামী লীগের হিংসার রাজনীতি মানুষ দেখেছে, অসহায়ভাবে ভুক্তভোগী হয়েছে। শুধু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে অনেক মানুষকে নির্মম নির্যাতন ও গুম খুনের শিকার হতে হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর সবাই যখন হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা করছে, তখনো এ ধরনের রাজনীতি দেখাটা দুঃখজনকই বলতে হয়। এর পরিণাম যে শুভ হতে পারে না, তা আওয়ামী লীগের নির্মম পতন দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায়।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান দেশ ও রাজনীতির ময়দানে একটি পরিচিত মুখ। তার শিক্ষা, রাজনীতি, সততা, সভ্যতা ও ভদ্রতা নিয়ে দেশ-বিদেশের মানুষ অবগত নন, তা নয়। কিন্তু তার পরও নিছক রাজনৈতিক কারণে তার প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো সেই পুরনো রাজনীতি চর্চার কথাই যেন মনে করিয়ে দেয়।
ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার), হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা মেসেঞ্জারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়া একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সমস্যা যেকোনো সময় হতে পারে এবং যে কেউ এর শিকারে পরিণত হতে পারেন। অনেকেই শিকার হচ্ছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জো বাইডেন কিংবা ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিও হ্যাকিং থেকে রেহাই পাননি। প্রযুক্তির এই সমস্যা মেনে নিয়েই মানুষ এগুলো ব্যবহার করছে। গুরুত্বপূর্ণ কারো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে তা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়ে নিউজ করা হচ্ছে।
গত ৩১ জানুয়ারি জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেলের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়। হ্যাকাররা শুধু অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেই ক্ষান্ত হয়নি, সেই অ্যাকাউন্ট থেকে ডা: শফিকুর রহমানের নামে নারীর প্রতি অবমাননাকর একটি পোস্টও দেয়। তারপরই শুরু হয় মিথ্যার বেসাতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে পরিচিত আইডিগুলো থেকে জামায়াতের আমিরকে নিয়ে একের পর মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হতে থাকে। এসব আইডি ব্যবহারকারীরা এতটুকুও বোঝার চেষ্টা করেননি, জামায়াতের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নারীকে নিয়ে পোস্টটি তার নয়। এটি অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার পর হ্যাকাররা লিখে পোস্ট করেছে। কিংবা তারা বুঝলেও নিছক জামায়াতের আমিরের প্রতি কিংবা জামায়াতের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষপ্রসূতভাবে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছে।
এখানেই আসে আল কুরআনে বিশ্বাসীদের কথা। পবিত্র কুরআনের সূরা আল হুজুরাতে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’
রাজনৈতিক দলগুলো কোনো বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষেত্রে সাধারণত অনেক সাবধানতা অবলম্বন করে। কোনো বিষয় সম্পর্কে সত্যটি জানার পরই কেবল তা নিয়ে মন্তব্য করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যেন তার ব্যত্যয় দেখছি। এক ধরনের তাড়াহুড়ার ভাব দেখা যাচ্ছে। এতে করে যে তাদের ভুল হচ্ছে, তা তারা কতটা উপলব্ধি করছে!
জামায়াতের আমিরের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার পর খুব দ্রুত একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমিরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করে। সেখানে জামায়াতের আমিরকে নিয়ে নানা অশালীন মন্তব্য করা হয়। ছাত্রসংগঠনটির এমন কর্মকাণ্ড সচেতন শিক্ষার্থী ও জনসাধারণ দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মনে করে। একই সাথে এগুলো আওয়ামী স্বৈরাচারী আমলের অপচর্চা হিসেবেও দেখে। একই সাথে সেই রাজনৈতিক দলের প্রধানও এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি যেন জার্মানির তথ্যমন্ত্রী ও হিটলারের সহযোগী সেই জোসেফ গোয়েবলসের বিশ্বাসের সাথে মিলে যাচ্ছে। গোয়েবলস বিশ্বাস করতেন, একটি মিথ্যাকে বারবার বললে তা সত্যে পরিণত হয়। জামায়াত আমিরকে নিয়ে একটি মিথ্যা বিষয় বারবার জনগণের কাছে উপস্থাপনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলটি গোয়েবলসের সেই বিশ্বাসের প্রতিরূপ দেখতে চান কি না বলা মুশকিল!
কিছুটা অবাক লেগেছে এই ঘটনায় গণমাধ্যমের পরিবেশনা দেখে। কিছু গণমাধ্যম ঘটনাটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যেন সত্যি-সত্যিই জামায়াতের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া পোস্টটি তার নিজের করা! পয়লা জানুয়ারি এ বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও কুৎসা রটানোর পর ২ জানুয়ারি এ বিষয়ে কাওরানবাজার থেকে প্রকাশিত একটি বহু পুরনো দৈনিকের প্রধান শিরোনাম ছিল— ‘নারীবিদ্বেষী পোস্ট জামায়াত আমিরের, ৯ ঘণ্টা পর হ্যাকিংয়ের দাবি।’ তেজগাঁও এলাকা থেকে প্রকাশিত অপর একটি পত্রিকার শিরোনাম ছিল— ‘নারীবিদ্বেষী পোস্ট ঘিরে বিতর্ক, হ্যাকের দাবি জামায়াতের।’ এ ছাড়াও ঢাকার অন্যান্য অনেক পত্রিকা ঘটনাটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে— যাতে পাঠকরা ধরেই নেবেন, জামায়াতের আমিরের এই পোস্টটি হ্যাকারের নয়, আমিরের নিজের!
সংবাদমাধ্যম কোন বিষয় কিভাবে উপস্থাপন করবে তা একান্তই তাদের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু যখন কোনো বিষয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থাপন করা হয় তখন সংবাদমাধ্যম ঘিরে প্রশ্ন ওঠে। কোনো ব্যক্তিকে জোর করে দোষী বানানোর ক্ষেত্রে এসব সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আমরা তো ভুলে যাইনি! ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ যখন জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ করেছিল, তখন এসব সংবাদমাধ্যম সেই গণজাগরণ মঞ্চের এক প্রকার মিডিয়া পার্টনারের ভূমিকা পালন করেছে। সাংবাদিকতার সব রকম লাজ-লজ্জার মাথামুণ্ডু খেয়ে নগ্নভাবে আওয়ামী লীগের দালালি করেছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদেরকে জোর করে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এসব সংবাদমাধ্যমের অপতৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। এরাই আওয়ামী লীগের হয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচারিক হত্যাকাণ্ডের যোগ্য করে তুলেছিল। এসব সংবাদমাধ্যমই এখন জামায়াত ও তার আমিরের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়াতে আদাজল খেয়ে নেমেছে।
প্রখ্যাত সাংবাদিক শফিক রেহমান সম্প্রতি সাংবাদিকদের এক সম্মেলনে যথার্থই এসব মিডিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, যারা এত দিন আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিল, তারা এখন বিএনপির পক্ষ হয়ে গেছে।
জুলাই বিপ্লবের পর অনেক সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত এসেছে সত্য। আর এগুলো সম্ভব হয়েছে গণমাধ্যমগুলোর ফ্যাসিবাদকে সমর্থন করার কারণে। কিন্তু এসবের সাথে দলগতভাবে জামায়াতের কোনো রকম সংশ্লিষ্টতা ছিল না। জামায়াত বরং অনেক স্থানে মিডিয়াকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছে। কিছু মিডিয়া হাউজ পরিদর্শনে গিয়ে সেগুলোর ওপর যেন কেউ আর হামলা করতে না পারে সে বিষয়ে কথা বলেছে। বিগত সাড়ে ১৫ বছর জামায়াতের সাথে গণমাধ্যম যে অন্যায় আচরণ করেছে তা নিয়ে জামায়াত কোনো রকম ক্ষোভ কিংবা কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তার পরও এখনো হরহামেশায়ই জামায়াতকে নিয়ে মিডিয়া হাউজগুলো মিথ্যা নিউজ করে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা নিউজ নিয়ে আলোচনা হলে জামায়াত প্রতিবাদ করার আগেই তারা সেগুলো অনেকে সরিয়ে ফেলে, আবার অনেকে ক্ষমাও চায়। কিন্তু হঠাৎ করে কী এমন হলো, জামায়াতের আমিরের এক্স আইডি হ্যাকের খবরকে হুলুস্থুল করে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে এ থেকে ফায়দা লাভের প্রয়োজন হলো? কেন মিডিয়াগুলো এই মিথ্যার বেসাতিতে নেমে পড়ল? কেন রাজনৈতিক দলগুলো জামায়াতের আমিরের মতো একজন সজ্জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা ও কুৎসা রটনায় লেগে গেল?
বলার অপেক্ষা রাখে না, জুলাই বিপ্লবের পর থেকে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যেখানে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে, তখন জামায়াত দেশের মানুষকে এক ইতিবাচক রাজনীতি উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে। জামায়াত-শিবির তাদের এই ইতিবাচক রাজনীতির ফলও পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয়ে নারীশিক্ষার্থীরা একটি বড় ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীশিক্ষার্থীদের শিবিরের নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রভাব আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও পড়তে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সারা দেশেই দেখা যাচ্ছে জামায়াতের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে নারীরা ভোটের মাঠে নেমেছেন। এ বিষয়টি জামায়াতের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের জন্য বেশ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনের ক্যাম্পেইনে জামায়াতের নারীদের ওপর হামলা করছে।
অন্যদিকে ৫ আগস্টের পর জামায়াতের আমিরকে ঘিরে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। নানা দেশের সাথে জামায়াতের কূটনৈতিক মহলে আলোচনা অনেকেই যেন ভালোভাবে নিতে পারছে না। সেই সাথে ভোটের মাঠও অনেকটা জামায়াতের দখলে বলে নানা সমীক্ষায় বেরিয়ে আসছে। এরই মধ্যে আগামী নির্বাচনে জামায়াতের ভালো ফলাফল করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে ঢাকার একজন মার্কিন কূটনীতিকের বরাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এমতাবস্থায় জামায়াতের আমিরকে বিতর্কিত করার জন্য নারীর মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে মিথ্যা ইস্যু বানানোর মাজেজা সচেতন মহলের বোঝার বাকি থাকে না।
মিথ্যা দিয়ে রাজনীতি করার দিন আর নেই। এখন মানুষ সত্যের পক্ষে। সত্য ও সুন্দর গ্রহণ করার জন্য মানুষ উদগ্রীব হয়ে আছে। তাই জামায়াতের আমিরকে ঘিরে মিডিয়ার মিথ্যার বেসাতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর পুরনো খেলা ধোপে টিকবে না। আল কুরআনের সূরা বনি ইসরাইলের সেই বাণীই সত্য প্রমাণিত হবে। ‘সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; মিথ্যা তো বিলুপ্ত হয়েই থাকে।’ দিন শেষে মানুষ মিথ্যা বর্জন করে সত্যকেই গ্রহণ করে।
লেখক : সম্পাদকীয় সহকারী, নয়া দিগন্ত