জহিরুল ইসলাম জুয়েল
তারল্য সঙ্কট হলো এমন এক অবস্থা কিংবা পরিস্থিতি, যেখানে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের কাছে দৈনন্দিন খরচ ও প্রয়োজন মেটানোর মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বা সহজে নগদায়নযোগ্য (টাকায় রূপান্তরযোগ্য) সম্পদ থাকে না। সহজ কথায়, যখন কারো পর্যাপ্ত অর্থ ব্যাংকে কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গচ্ছিত থাকে; কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে হাতে কোনো ক্যাশ বা নগদ টাকা থাকে না, তখন তাকে তারল্য সঙ্কট বলে।
ব্যাংক গ্রাহকের চাহিদামতো নগদ টাকা দিতে পারে না এবং গ্রাহক টাকা তুলে নিতে চাইলে ব্যাংক তা দিতে ব্যর্থ হয়। অনাস্থার কারণে আমানতকারীরা একসাথে বেশি টাকা তুলে নিলে বা ব্যাংক অতিরিক্ত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিয়ে ফেললে এমনটা ঘটে। অতিমারী কিংবা যুদ্ধের আশঙ্কা থেকেও এমন সঙ্কটের উদ্ভব হতে পারে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে লেনদেন করতে পারে না এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জরুরি ধারের জন্য ছুটতে হয়।
কোম্পানির সব সম্পদ অন্য কোথাও আটকে গেলেও এটা হতে পারে। বাকিতে বেশি পণ্য বিক্রি হলে বা বিক্রি কমে গিয়েও তারল্য সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে। তখন কোম্পানি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীর হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। মানুষ নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে ভয় পায়।
তারল্য সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব হলো ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেয়া কমিয়ে দেয়। এতে নতুন কারখানা তৈরি বা পুরনো কারখানা সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। উল্টো কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়। উৎপাদন কম হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যায়। চাহিদা অনুযায়ী পণ্য না থাকলে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। নগদ টাকা পেতে ব্যাংকগুলো পরস্পরের কাছে ধার করতে বাধ্য হয়। এতে সুদের হার বাড়ে, যার ফলে ব্যবসায়ীদের খরচ অনেক বেড়ে যায়।
গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে সময়মতো টাকা তুলতে না পারলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারান। মানুষ তখন ব্যাংকে টাকা জমা না রেখে ঘরে বা অন্য মাধ্যমে রাখতে শুরু করে। সময়মতো নগদ টাকার জোগান দিতে না পারলে অনেক ভালো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও দেউলিয়া হতে পারে। এর ফলে ব্যাংকের ঋণ আদায় বন্ধ হয়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে যায়। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির হার কমে যায়।
এর সমাধান হচ্ছে, ব্যাংকিং ও করপোরেট অফিসগুলোতে সাধারণ গ্রাহকদের আস্থাভাজন বিশ্বস্ত, মেধাবী, সৎ ও যুগোপযোগী পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা। দাতা সংস্থার শর্তাবলির কারণে, অনেকসময় এই সহজ সমাধানটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় উপায়টি হচ্ছে, ই-ক্যাশ, সফট ক্যাশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করা। এই কমিশন ধাপে ধাপে কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে ই-ক্যাশ বাস্তবায়ন করবে। এই একটি সমাধান অনেকগুলো সমস্যা দূর করে দেবে :
টাকা ছাপানোর খরচ থাকবে না, ন্যায্য মূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে, শক্তিশালী ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, অলস টাকার যথাযথ বিনিয়োগ করা যাবে, কলমানি রেট বাড়ার সুযোগ থাকবে না, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের শর্তপূরণ সহজ হবে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সহজতর হবে, আর্থিক তথ্য গোপন রাখতে শক্তিশালী এনক্রিপশন ও বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ বা মুখ) ব্যবহার করা যাবে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কিউআর কোড স্ক্যান করে বা ট্যাপ করে পেমেন্ট করা যাবে, অনেকগুলো ফিজিক্যাল কার্ড বা নগদ টাকা বহন করার ঝামেলা দূর করবে।
তারল্য সঙ্কট সমগ্র অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি এবং জনগণের জীবনমানের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। এ সঙ্কট মোকাবেলায় ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, জবাবদিহি ও জনআস্থা প্রতিষ্ঠা জরুরি।
তবে ই-ক্যাশ কোনো জাদুকরী সমাধান নয়; এর সফল বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী কমিশন ও নীতিমালা, সাইবার নিরাপত্তা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : সিনিয়র ম্যানেজার, ক্রেডিট কন্ট্রোল বিডিকম অনলাইন লিমিটেড