জাতিসঙ্ঘ পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা যায়, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধিত্বের শিকার ব্যক্তিরা বিদ্যমান নাগরিক অধিকার ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিবন্ধিতা কোনো অভিশাপ বা করুণার বিষয় নয়; মানবজীবনের স্বাভাবিক অংশ। শারীরিক, মানসিক, দৃষ্টি বা শ্রবণজনিত অক্ষমতা নিয়ে অনেকে জন্মগ্রহণ করে অথবা পরে কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রতিবন্ধী হয়। তাদের সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার সুযোগ নেই। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ‘কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না’- এ মূলমন্ত্র বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রতিবন্ধিতা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন- (ক) শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, (খ) দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা অর্থাৎ সম্পূর্ণ বা আংশিক দৃষ্টিহীনতা, (গ) শ্রবণ ও বাক্ প্রতিবন্ধিতা ও (ঘ) মানসিক প্রতিবন্ধিতা অর্থাৎ অটিজম বা ডাউন সিনড্রোমের মতো স্নায়বিক সমস্যা।

বাংলাদেশ সরকার বিশ্বের উন্নত দেশের মত প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষা ও সুরক্ষা বিষয়ে যুগোপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রণয়ন করা হয়েছে প্রতিবন্ধীবিষয়ক জাতীয় নীতিমালা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন-২০১৩ এবং জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইন-২০২৩। উল্লিখিত নীতিমালা ও আইনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

প্রতিবন্ধীবিষয়ক জাতীয় নীতিমালায় প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, চিকিৎসাসহ পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, মুক্ত চলাচল ও যাতায়াতের সুযোগ সুবিধা, চিত্তবিনোদন প্রভৃতির ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে সব মানুষের অধিকার, মানবসত্তার মর্যাদা, মৌলিক মানবাধিকার ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারসংক্রান্ত জাতিসঙ্ঘ সনদ অনুসমর্থন করায় সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করে।

আইনটিতে প্রতিবন্ধীর অধিকার বিষয়ে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিম্ন বর্ণিত অধিকার থাকবে। যথা- (ক) পূর্ণমাত্রায় বেঁচে থাকা ও বিকশিত হওয়া (খ) সর্বক্ষেত্রে সমান আইনি স্বীকৃতি এবং বিচারগম্যতা (গ) উত্তরাধিকারপ্রাপ্তি (ঘ) স্বাধীন অভিব্যক্তি ও মতপ্রকাশ এবং তথ্যপ্রাপ্তি (ঙ) মাতা-পিতা, বৈধ বা আইনগত অভিভাবক, সন্তান বা পরিবারের সাথে সমাজে বসবাস, বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন ও পরিবার গঠন (চ) প্রবেশগম্যতা (ছ) সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে, প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী, পূর্ণ ও কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ (জ) শিক্ষার সব স্তরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তি সাপেক্ষে, একীভূত বা সমন্বিত শিক্ষায় অংশগ্রহণ (ঝ) সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মে নিযুক্তি (ঞ) কর্মজীবনে প্রতিবন্ধিতার শিকার ব্যক্তি কর্মে নিয়োজিত থাকার, অন্যথায় যথাযথ পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণপ্রাপ্তি (ট) নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা এবং নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের সুবিধাপ্রাপ্তি (ঠ) প্রাপ্যতা সাপেক্ষে, সর্বাধিক মানের স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তি (ড) শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রসহ প্রযোজ্য সব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য উপযোগী পরিবেশ ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তি (ঢ) শারীরিক, মানসিক ও কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করে সমাজজীবনের সব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে একীভূত হওয়ার লক্ষ্যে সহায়কসেবা ও পুনর্বাসন সুবিধাপ্রাপ্তি; (ণ) মাতা-পিতা বা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মা-বাবা বা পরিবার হতে বিচ্ছিন্ন হলে বা তার অবসান ও ভরণ-পোষণের যথাযথ সংস্থান না হলে, যথাসম্ভব, নিরাপদ আবাসন ও পুনর্বাসন (ত) সংস্কৃতি, বিনোদন, পর্যটন, অবকাশ ও ক্রীড়া কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ (থ) শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বাক্ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিজ ইচ্ছানুযায়ী, যথাসম্ভব, বাংলা ইশারা ভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণ (দ) ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা (ধ) স-সহায়ক সংগঠন ও কল্যাণমূলক সঙ্ঘ বা সমিতি গঠন ও পরিচালনা (ন) জাতীয় পরিচয়পত্রপ্রাপ্তি, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, ভোট প্রদান এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ; এবং (প) সরকার কর্তৃক সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো অধিকার।

আইনটির উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষাসংক্রান্ত সমাজকল্যাণমন্ত্রীর সভাপতিত্বে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় সমন্বয় কমিটি, সচিবের সভাপতিত্বে জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলা কমিটি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে উপজেলা কমিটি ও সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে শহর কমিটি করার বিধান এবং প্রতিটি কমিটির দায়িত্ব ও কার্যাবলি নির্ধারণ করে দেয়া আছে।

আইনটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান, গণপরিবহনে আসন সংরক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ভর্তিসংক্রান্ত বৈষম্যের প্রতিকার, গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণ, প্রতিবন্ধিতার কারণে কর্মে নিযুক্ত না করা এবং বৈষম্য নিষিদ্ধকরণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান বিষয়ে বিধান করা আছে।

নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধীর সুরক্ষায় নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করে বলা হয়- এ আইন বলবৎ হওয়ার পর সরকার যথাশিগগির সম্ভব এই আইনের বিধান অনুযায়ী নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট নামের একটি ট্রাস্ট স্থাপন করবে। ট্রাস্টের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে সমাজের অংশ হিসেবে মর্যাদার সাথে বসবাস করার উপযোগী করে তুলার লক্ষ্যে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে- (ক) যথাসম্ভব শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদান করা; (খ) উপযোগী শিক্ষা ও কারিগরি জ্ঞানের ব্যবস্থা করা; এবং (গ) সামাজিকভাবে ক্ষমতায়ন করা।

ট্রাস্টের প্রশাসন ও পরিচালনা বিষয়ে আইনটিতে বলা হয়- ট্রাস্টের প্রশাসন ও পরিচালনা একটি ট্রাস্টি বোর্ডের ওপর ন্যস্ত থাকবে। ট্রাস্ট যেসব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্য সম্পাদন করতে পারবে ওই বোর্ডও সেসব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্য সম্পাদন করতে পারবে।

এ আইনে ২৬ সদস্য বিশিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ড গঠন এবং প্রতি জেলায় ১২ সদস্যের জেলা কমিটি গঠনের বিষয় উল্লেখ আছে। ট্রাস্টের তহবিল বিষয়ে বলা হয়, ট্রাস্টের একটি তহবিল থাকবে, যা দু’টি অংশে বিভক্ত হবে, যথা- (ক) স্থায়ী তহবিল এবং (খ) চলতি তহবিল। তহবিলে সরকার অর্থ প্রদান করবে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইন, ২০২৩ প্রণয়ন করা হয়। আইনটিতে ফাউন্ডেশনের কার্যাবলি বিষয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এ বর্ণিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণসহ আরো ৩৪ ধরনের কার্যাবলির কথা বলা আছে। ফাউন্ডেশনের পরিচালনা প্রশাসন বিষয়ে আইনটিতে উল্লেখ আছে, ফাউন্ডেশনের পরিচালনা প্রশাসন বোর্ডের ওপর ন্যস্ত থাকবে। ফাউন্ডেশন যেসব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্য সম্পাদন করতে পারবে পরিচালনা বোর্ডও সেসব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্য সম্পাদন করতে পারবে।

প্রতিবন্ধীদের প্রতি সহানুভূতি নয় বরং তাদের অধিকার ও সমমর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার ও নিজ নিজ অবস্থা থেকে প্রতিবন্ধীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূর করতে হবে। বিশেষ চাহিদাসসন্ন শিশুদের জন্য সমন্বিত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করাসহ তাদের জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একটি বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ গঠনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম-অংশগ্রহণ অপরিহার্য। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সরকারের প্রণীত নীতিমালা, অধিকার ও সুরক্ষা আইন, সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন এবং ফাউন্ডেশন আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে সবাই একযোগে কাজ করতে পারলে নীতিমালা ও আইনের লক্ষ্যগুলো অর্জিত হবে।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com