আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে গতিশীল অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করে। এই অর্থনৈতিক কাঠামোর স্পর্শকাতরতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে সাধারণত সরকারের কোনো প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ব্যক্তিত্বকে অর্থমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব দেয়া হয়। তবে মন্ত্রী যত দক্ষ হোন না কেন, অর্থনীতির মূল যদি নড়বড়ে হয়, তবে পুরো ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়তে বাধ্য। আমাদের অর্থনীতির সেই মূল হচ্ছে ব্যাংক খাত। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের এ খাতটি এখন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ব্যাংক খাত বর্তমানে পাঁচটি সমস্যামূলক ঝুঁকিতে আছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের প্রধান পাঁচটি ঝুঁকি ও আর্থিক সূচক হলো : মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) : মাইনাস (-) ২.৬৪ শতাংশ; খেলাপি ঋণ (এনপিএল) : মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ; সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) : মাইনাস (-) ৪.৮১ শতাংশ; ইক্যুইটির বিপরীতে আয় (আরওই) : মাইনাস (-) ২৪৩.৯ শতাংশ; আয়-ব্যয়ের অনুপাত : ৯১ শতাংশ।
সূচকগুলো অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। যেখানে ব্যাংকের নিজস্ব মূলধন থাকার কথা উদ্বৃত্ত, সেখানে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত মাইনাসে নেমে যাওয়া মানে ব্যাংকগুলো চরম মূলধন ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্পদের বিপরীতে আয় এবং ইক্যুইটির বিপরীতে আয় ঋণাত্মক হওয়া নির্দেশ করে যে, ব্যাংকগুলো কোনো মুনাফা তো করতে পারছেই না, উল্টো বিনিয়োগকারীদের মূলধন প্রতিনিয়ত ক্ষয় হচ্ছে। তার ওপর আয়-ব্যয়ের অনুপাত ৯১ শতাংশ হওয়ার অর্থ হলো, ব্যাংকের আয়ের বেশির ভাগ চলে যাচ্ছে এর পরিচালন ও প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে। অর্থাৎ, ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকের হাতে কোনো বাড়তি রক্ষাকবচ থাকছে না।
এই পাঁচ ঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং ধ্বংসাত্মকটি হলো ‘খেলাপি ঋণ’। একে ব্যাংক খাতের একটি ‘ক্রনিক’ বা দীর্ঘমেয়াদি দুরারোগ্য ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই একটি রোগ যদি নিয়ন্ত্রণ বা মুক্ত করা যেত, তা হলে ব্যাংক খাতের বেশির ভাগ সমস্যার স্বয়ংক্রিয় সমাধান হয়ে যেত; কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় বিপুল টাকার ঋণ ঢালাওভাবে বিতরণ করা হয়েছে। যাদের রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেয়া হয়েছে, তাদের বড় একটি অংশের উদ্দেশ্য ছিল ওই টাকা পরিশোধ না করা। তারা ঋণকে নিজেদের সম্পদ ও ক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ফলে ব্যাংকের বোঝা দিন দিন ভারী হয়েছে। সাধারণ মানুষের আমানত চলে গেছে গুটিকয় লুটেরার পকেটে।
খেলাপি ঋণের এ বোঝা ব্যাংক বহন করলেও এর চূড়ান্ত আঘাত কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর গিয়ে বর্তেছে। কারণ ব্যাংকগুলো যখন বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে তারল্য সঙ্কটে ভোগে, তখন সাধারণ আমানতকারীরা তাদের আমানতের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েন। একই সাথে ভালো উদ্যোক্তারা ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন, যা দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ধস নামায়। ফ্যাসিবাদী জমানায় ব্যাংক খাতের নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ব্যাংকের সৎ ও দক্ষ পরিচালকদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে এমন সব ব্যক্তিকে, যারা নিজেরা দেশের বড় বড় খেলাপি ঋণের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী। চোরকে যখন চাবির গোছা দেয়া হয়, তখন সেই ব্যবস্থার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
ব্যাংক ব্যবস্থা যে একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তার সর্বশেষ প্রমাণ আমরা দেখেছি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আন্দোলনে। ব্যাংকের টাকা লোপাটের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন এবং এর দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষ নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন। যদি এই আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে না উঠত, তা হলে গ্রাহকরা তাদের আমানতের যে সামান্য অংশ বা লভ্যাংশ ফেরত পেয়েছেন, তাও হয়তো পেতেন না। তবে শুধু আন্দোলন শেষ কথা নয়। বর্তমানে জনমনে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক লুটের এই মহোৎসবের জন্য কি শুধু কয়েকজন পুতুলকে দণ্ড দিলে সঙ্কটের সমাধান হবে? পর্দার আড়ালের হোতারা কি অধরাই থেকে যাবে?
যদি আমরা সত্যি একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে ব্যাংক খাতকে এই পাঁচ ঝুঁকি থেকে মুক্ত করার বিকল্প নেই। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং একটি স্বাধীন, শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক বিবেচনা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়েছেন, তাদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। সেই সাথে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী বা খেলাপি ব্যক্তি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসতে না পারেন। রোগ যখন ক্রনিক আকার ধারণ করে, তখন সাধারণ ওষুধে কাজ করে না; এর জন্য চাই বড় ধরনের অস্ত্রোপচার। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বাঁচাতে হলে এখনই সেই কঠোর ও আপসহীন সার্জারির পথে হাঁটতে হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক