রাষ্ট্রপতির পদ কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার নয়; এটি জাতির সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আস্থার প্রতীক। রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও তার নৈতিক মর্যাদা, সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং জাতীয় গুরুত্ব অপরিসীম। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার প্রতীক, সংবিধানের রক্ষক এবং জাতীয় ঐক্যের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। তাই এ পদে এমন একজনকে নির্বাচন করা উচিত, যিনি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে থেকে পুরো জাতির আস্থা অর্জন করতে সক্ষম।

বাংলাদেশে আমরা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, সাংবিধানিক সঙ্কট, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের চিত্র দেখেছি। এ বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির পদকে কখনো দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়; বরং এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করতে হবে, যিনি ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষের কাছেও সৎ, নিরপেক্ষ ও মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।

রাষ্ট্রপতির প্রথম ও প্রধান গুণ হবে নিখাদ দেশপ্রেম। তার কাছে দল, ব্যক্তি কিংবা কোনো বিদেশী শক্তির স্বার্থের চেয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ সর্বাগ্রে থাকবে। তিনি এমন একজন হবেন, যার অতীত কর্মকাণ্ড দেশপ্রেম, সততা ও দায়িত্ববোধের সাক্ষ্য বহন করে।

রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন হতে হবে প্রশ্নাতীত। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা নৈতিক স্খলনের কোনো অভিযোগ থাকা উচিত নয়। জনগণ তার সততা থেকে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা অর্জন করবে। অসৎ ব্যক্তি সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন না।

রাষ্ট্রপতি অতীতে যে দলের সাথেই যুক্ত থাকুন না কেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তার একমাত্র পরিচয় হবে, তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সমগ্র জাতির প্রতিনিধি। সংবিধানের রক্ষক। তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, বক্তব্য এবং সাংবিধানিক পদক্ষেপে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিফলিত হতে হবে।

রাষ্ট্রপতির সংবিধান সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট বা সাংবিধানিক জটিলতা দেখা দিলে তিনি সংবিধানের আলোকে নিরপেক্ষ ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

একজন রাষ্ট্রপতির মধ্যে নৈতিক সাহস থাকতে হবে। প্রয়োজনে তিনি রাজনৈতিক চাপ, দলীয় প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত অনুরোধ উপেক্ষা করে সংবিধান ও রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ়অবস্থান নিতে সক্ষম হবেন। তিনি নিজের সাংবিধানিক সীমারেখা অতিক্রম করবেন না। তিনি দায়িত্বশীলতার সাথে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন এবং নির্ধারিত সীমা যথাযথভাবে মেনে চলবেন।

রাষ্ট্রপতির দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থাকা উচিত। অভিজ্ঞতা তাকে সঙ্কটময় সময়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে সক্ষম করবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির সুস্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও কূটনীতি পরস্পরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিদেশে রাষ্ট্রপতি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেশের মর্যাদা সমুন্নত করবেন। তার ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, শালীনতা এবং কূটনৈতিক দক্ষতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করতে সহায়ক হবে।

রাষ্ট্রপতির মধ্যে স্বাধীন চিন্তা ও বিবেকবোধ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার সিদ্ধান্ত হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক ও সংবিধানসম্মত।

বিনয়, শিষ্টাচার ও মানবিকতা একজন রাষ্ট্রপতির অপরিহার্য গুণ। সাধারণ মানুষের প্রতি সম্মান, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং সংযত আচরণ তার ব্যক্তিত্বকে আরো মর্যাদাপূর্ণ করে তুলবে।

জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রপতির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তিনি এমন ভাষায় কথা বলবেন, যা বিভাজন নয়, বরং সম্প্রীতি সৃষ্টি করবে। ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতভেদে কোনো নাগরিক যেন নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন। রাষ্ট্রপতির প্রতিটি বক্তব্য জাতিকে একত্রিত করার বার্তা বহন করবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়, তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও সেই মানসিকতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সম্ভব হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত। সংবিধান হয়তো তা বাধ্যতামূলক করেনি, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সাবেক বিচারপতি, কূটনীতিক, সুশীলসমাজের প্রতিনিধিসহ সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদের মতামত বিবেচনা করতে পারে। এতে রাষ্ট্রপতির গ্রহণযোগ্যতা যেমন বাড়বে, তেমনি জনগণের আস্থাও সুদৃঢ় হবে।

আজকের বাংলাদেশ এমন একসময় অতিক্রম করছে, যখন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, জবাবদিহি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। একজন দেশপ্রেমিক, সৎ, নিরপেক্ষ, নির্দলীয়, সংবিধান-প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, বিচক্ষণ এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা গেলে তা শুধু রাষ্ট্রপতির মর্যাদা বাড়াবে না; বরং গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করবে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদাও আরো সুসংহত করবে।

রাষ্ট্রপতি কোনো রাজনৈতিক দলের নন; তিনি সমগ্র বাংলাদেশের। সংবিধান হবে তার পথপ্রদর্শক। ন্যায়বিচার হবে তার আদর্শ। জনগণ হবে তার দায়িত্ব। সেই সাথে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ হবে তার সর্বোচ্চ অঙ্গীকার।

যে সরকার এ নীতি সামনে রেখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে, সেই সরকার শুধু একটি সাংবিধানিক পদ পূরণ করবে না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী, মর্যাদাপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তিও আরো সুদৃঢ় করবে।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

hrmrokan@hotmail.com