আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বৈশ্বিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশী তরুণদের জোরপূর্বক নিয়োগের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ হয়েছে। বেকার যুবকদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে এভাবে মানবপাচারের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেয়ার পেছনে সংশ্লিষ্ট চক্র ও দালালদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে। বাংলাদেশী যুবকদের আকর্ষণীয় বেতনের লোভনীয় চাকরির আশ্বাসে রাশিয়ায় নেয়া হয়। মস্কোয় পৌঁছানোর পর এই শ্রমিকদের রুশ ভাষায় কিছু নথিপত্র স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। পরে জানা যায়, সেগুলো আসলে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর সাথে চুক্তিপত্র। ভুক্তভোগী শ্রমিকদের একটি সেনাক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের ড্রোন পরিচালনা, চিকিৎসাগত উদ্ধারকাজ এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহারের মৌলিক কমব্যাট প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর তাদের জোরপূর্বক ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে ঠেলে দেয়া হয়।
এই প্রতারণার শিকার হয়ে ঠিক কতজন শ্রমিক রাশিয়া গেছেন বা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নিয়েছেন, তার কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে এ বিষয়ে অনুসন্ধানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। ভুক্তভোগী শ্রমিকরা রাশিয়ায় রুশ বাহিনীর সাথে শত শত বাংলাদেশীকে যুদ্ধক্ষেত্রে বা তাদের কাছাকাছি থাকতে দেখেছেন। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি ক্ষেত্রে ৩০ জনের অধিক বাংলাদেশী নিখোঁজ বা প্রতারণার শিকার বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তদন্তে কিছু যুবকের রাশিয়া যাওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া বা প্রাণ হারানোর তথ্যও উঠে এসেছে।
২০২৩ সালের পর থেকে রুশ শ্রমবাজারে কর্মী যাওয়ার হার কিছুটা বৃদ্ধি পায়। কোনো কোনো বছরের তথ্যে দেখা গেছে, কেবল এক বছরেই চার হাজারের অধিক কর্মী রাশিয়া গেছেন। বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশী কর্মী রাশিয়ায় বসবাস ও কাজ করছেন। বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশী শ্রমিকদের রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মতো মানবপাচারের এই গুরুতর ফাঁদ বা সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য বহুমুখী ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
দি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস সংবাদ সংস্থার প্রকাশিত এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেসামরিক কাজের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশী শ্রমিকদের রাশিয়ায় প্রলুব্ধ করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাদের প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধে ঠেলে দেয়া হয়। অনেককে সহিংসতা, কারাদণ্ড বা মৃত্যুর হুমকি দেয়া হয়েছিল। এপি রাশিয়ার সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা তিনজন বাংলাদেশীর সাথে কথা বলেছে। এদের মধ্যে রহমান নামের একজন জানান, মস্কোয় পৌঁছানোর পর তিনি এবং তার সহকর্মী বাংলাদেশী শ্রমিকদের একটি দলকে কিছু রুশ নথিপত্র সই করতে বলা হয়, যা পরে সামরিক চুক্তি বলে প্রমাণিত হয়। তাদের ড্রোন যুদ্ধ কৌশল, চিকিৎসা ক্ষেত্রে সরিয়ে নেয়ার পদ্ধতি এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে মৌলিক যুদ্ধ কৌশলের প্রশিক্ষণ নিতে একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। রহমান প্রতিবাদ করে অভিযোগ করেন, এটি সেই কাজ নয় যার জন্য তিনি রাজি হয়েছিলেন। একজন রুশ কমান্ডার একটি অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে এক নির্মম উত্তর দেন, ‘তোমার এজেন্ট তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে। আমরা তোমাকে কিনে নিয়েছি।’ রহমান, যিনি সাত মাস পর পালিয়ে দেশে ফিরে এসে বলেন, ‘তারা বলত, তোমরা কাজ করছ না কেন? কেন কাঁদছ? এবং আমাদের লাথি মারত।’ নিখোঁজ থাকা অপর তিন বাংলাদেশীর পরিবার জানিয়েছে, তাদের প্রিয়জনরাও আত্মীয়দের কাছে একই ধরনের ঘটনার কথা জানিয়েছেন।
একটি গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্টে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করার সময় মোহন মিয়াজিকে রুশ সেনাবাহিনীতে নাম লেখাতে বাধ্য করা হয়। যখন তিনি কাউকে হত্যা করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন নিয়োগকারী জানান, একজন ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে তার দক্ষতা তাকে যুদ্ধ নয়; বরং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা ড্রোন ইউনিটের জন্য আদর্শ প্রার্থী করে তুলেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মিয়াজিকে পূর্ব ইউক্রেনের দখলকৃত আভদিভকা শহরের একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশে ফিরে মুন্সীগঞ্জের নিজ গ্রামে তিনি বলেন, কোনো আদেশ অমান্য করলে বা ভুল করলে তাকে কোদাল দিয়ে পেটানো হতো, হাতকড়া পরিয়ে একটি স্যাঁতস্যাঁতে বেসমেন্ট সেলে আটকে রাখা হতো।
সালমা আকতার বহুদিন তার স্বামীর কোনো খোঁজ পাননি। শেষ কথোপকথনে ৪০ বছর বয়সী আজগর হোসেন তাকে বলেছিলেন, তাকে রুশ সেনাবাহিনীতে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। তার স্ত্রী জানান, আজগর হোসেন রাশিয়ায় লন্ড্রি পরিচারকের চাকরি পাওয়ার বিশ্বাস নিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দেশ ছেড়েছিলেন। দুই সপ্তাহ তিনি নিয়মিত যোগাযোগ করেছিলেন। এরপর তিনি তার স্ত্রীকে জানান, তাকে একটি সেনাক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে তাদের অস্ত্র ব্যবহারের এবং ৮০ কেজি পর্যন্ত ভারী বোঝা বহন করার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তার স্ত্রী বলেন, ‘এসব দেখে তিনি খুব কেঁদেছিলেন এবং তাদের বলেছিলেন, আমরা এসব করতে পারি না। আমরা আগে কখনো এমন কাজ করিনি।’ গ্রামের পরিবারগুলো নিয়োগকারী এজেন্টের মুখোমুখি হয় এবং জানতে চায়— কেন তাদের প্রিয়জনদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এজেন্ট অবজ্ঞাভরে জবাব দিয়ে বলেছিল, এটি রাশিয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং সে জোর দিয়ে বলে, লন্ড্রি-কর্মীদেরও একই ধরনের প্রশিক্ষণ নিতে হয়।
বিশ্বজুড়ে মানবপাচারের নেটওয়ার্ক
কেবল বাংলাদেশ নয়— নেপাল, ভারত, কিউবা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, জর্দান, ইরাক এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ বিশেষত সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, কেনিয়ার হাজার হাজার শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিক এই আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের শিকার হয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশী নাগরিকদের অন্যতম হলো নেপালিরা। প্রতারক এজেন্টরা ক্লিনার, হেল্পার বা সিকিউরিটি গার্ডের কাজের কথা বলে কিংবা রাশিয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগের লোভ দেখিয়ে বিদেশী যুবকদের আকৃষ্ট করে। পরবর্তীতে তাদের মোবাইল ফোন ও যোগাযোগ মাধ্যম কেড়ে নিয়ে ইউক্রেন সীমান্তে যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় ভারত সরকার বেশ কয়েকজন মানবপাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে এবং মস্কোর কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে বন্দী হওয়া বেশ কয়েকজন কিউবান ও আফ্রিকান যুদ্ধবন্দী গণমাধ্যমের সামনে স্বীকার করেছেন, তাদের কাজের কথা বলা হয়েছিল, জোরপূর্বক যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয়। সামনের সারির উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাসল্ট ইউনিটে সরাসরি পাঠানোর আগে নিয়োগপ্রাপ্তদের অত্যন্ত কম সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বিদেশীদের একটি বিশাল অংশ মোতায়েনের প্রথম দিকেই নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়।
ব্যাপক প্রাণহানি
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর বিয়য়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি থিংকট্যাংক নিশ্চিত হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে বেসামরিক নাগরিকদের ওপরও। জাতিসঙ্ঘের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর ২০২৫ সালেই ইউক্রেনে সবচেয়ে বেশি বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। উভয় পক্ষের সামরিক হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখে পৌঁছেছে। নিহতের পাশাপাশি আহত ও নিখোঁজ সেনাদেরও হিসাবে ধরা হয়েছে। ২০২২ সালে আক্রমণ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার প্রায় ১২ লাখ সেনা হতাহত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের কোনো বড় শক্তি কোনো একক যুদ্ধে এমন বিশাল সংখ্যক প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েনি।
ভাড়াটে সৈন্য নাকি মানবপাচার
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করা বিদেশী নাগরিকদের প্রায়শই ‘ভাড়াটে সৈন্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টি অতটা সহজ বা সরল নয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের সবাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভাড়াটে সৈন্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এর কারণ হলো— অনেক বিদেশী নাগরিকই রুশ সশস্ত্রবাহিনীতে যোগ দেয়ার আগে রাশিয়ার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের আইনি মর্যাদা প্রথাগত ‘ভাড়াটে সৈন্য’-এর সংজ্ঞার সাথে পুরোপুরি মেলে না। অন্যদিকে, অনেক বিদেশী নাগরিক যুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় যাননি। নির্মাণ খাত, নিরাপত্তা, কৃষি বা অন্যান্য বেসামরিক পেশায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে তাদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে তারা বস্তুত মানবপাচারের শিকার হিসেবে গণ্য হতে পারেন।
এ জাতীয় কর্মকাণ্ড ‘জাতিসঙ্ঘের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠিত অপরাধবিরোধী সনদ’ এবং ‘পালেরমো প্রোটোকল’-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মতো রাশিয়াও আন্তর্জাতিক এসব চুক্তিতে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে, যা মানবপাচারকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হচ্ছে, তাদের তথাকথিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযানে’ অংশগ্রহণকারী সব বিদেশী নাগরিক সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এতে যোগ দিয়েছেন।
মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে
যেসব অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি বা অসাধু ব্যক্তি সাধারণ যুবকদের চাকরির লোভ দেখিয়ে রাশিয়ায় পাচার করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলে রুশ কর্তৃপক্ষের সাথে জোরালো যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। যেসব নাগরিক প্রতারণার শিকার হয়ে রুশ সামরিক বাহিনীতে আটকা পড়েছেন বা যুদ্ধক্ষেত্রে নীত হয়েছেন, তাদের দ্রুত নিরাপদ ও সসম্মান প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব পরিবার দালালদের চক্করে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে বা প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তাদের আর্থিক ও আইনি সহায়তা দিতে হবে। এছাড়া যারা ট্রমা বা শারীরিক আঘাত নিয়ে ফিরে আসছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে তরুণদের জীবনের ঝুঁকিযুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেয়া এক চরম অমানবিক অপরাধ। এটি কেবল একটি পাচার চক্রের অপকর্ম নয়; বরং সার্বিক অভিবাসনব্যবস্থার এক বড় ধরনের নিরাপত্তা ত্রুটি। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এখন সময় এসেছে দ্রুত কূটনৈতিক ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক ফাঁদ বন্ধ করা এবং বিদেশে নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার