এক সময় আজাদ কাশ্মিরকে পাকিস্তানের রাজনীতির ল্যাবরেটরি বলা হতো। এই ল্যাবরেটরিতে নিত্যনতুন রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হতো। এরপর ওই পরীক্ষাগুলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে পুনরাবৃত্তি করা হতো। সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে এই ল্যাবরেটরিটি এখন একটি সার্কাসে পরিণত হতে চলেছে, যেখানে বিভিন্ন বাজিকর অত্যন্ত বিশৃঙ্খলার সাথে নিজ নিজ খেলা প্রদর্শন করছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এসব বাজিকরের কারো খেলাতেই হাতের কৌশল দেখা যাচ্ছে না। তারা এই ল্যাবরেটরিতে অতীতে হয়ে যাওয়া কিছু পুরনো রাজনৈতিক পরীক্ষাকেই অত্যন্ত গর্বের সাথে নতুন খেলা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। আর যখন তারা প্রশংসা পান না, তখন ভীষণ মন খারাপ করেন।

আজাদ কাশ্মিরে সাম্প্রতিক প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনের বিষয়টিই দেখুন। মুসলিম লীগ (এন) আজাদ কাশ্মিরে তাদের দলের সভাপতি ও প্রাক্তন স্পিকার শাহ গোলাম কাদিরকে উপেক্ষা করে টানা দুবার নির্বাচনে হেরে যাওয়া ইফতেখার গিলানিকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দিয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর এই ভদ্রলোককে টেকনোক্র্যাট আসনে অ্যাসেম্বলিতে আনা হয়। টেকনোক্র্যাট আসনে অ্যাসেম্বলির সদস্য হওয়া মাত্রই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কিছু ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থীর তালিকায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। ইফতেখার গিলানির পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি দেয়া হয়েছিল যে, তিনি অত্যন্ত শিক্ষিত একজন মানুষ। যদি এই যুক্তিটি সত্যিই মেনে নেয়া হয়, তাহলে তার আসনের জনগণ এত যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীর পক্ষে রায় দিলেন না কেন?

শাহ গোলাম কাদির আজাদ কাশ্মিরে মুসলিম লীগের (এন) প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি সরদার সিকান্দার হায়াত ও রাজা ফারুক হায়দারের সাথে ২০১০ সালে মুসলিম কনফারেন্স ছেড়ে মুসলিম লীগে (এন) যোগ দেন। সরদার সিকান্দার হায়াত মুসলিম কনফারেন্সে ফিরে যান; কিন্তু রাজা ফারুক হায়দার ও শাহ গোলাম কাদির মুসলিম লীগের (এন) পাশেই দাঁড়িয়ে থাকেন। আজাদ কাশ্মিরের সাম্প্রতিক নির্বাচনেও শাহ গোলাম কাদির দলের সভাপতি হিসেবে প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। তার কৃতিত্ব হলো, ১৯৯৮ সালে তিনি প্রথমবারের মতো একটি মুহাজির (শরণার্থী) আসনে আজাদ কাশ্মির অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য আজও অধিকৃত কাশ্মিরে বসবাস করেন। তিনি আগামীতেও মুহাজির আসনে বিজয়ী হতে পারতেন; কিন্তু তিনি নিলম উপত্যকায় কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা গড়ে তোলেন। ২০১৬ সালে তিনি নিলম উপত্যকা থেকে সাধারণ আসনে প্রথমবার নির্বাচনে লড়েন এবং জয়লাভ করেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির পক্ষ থেকে তাকে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়; কিন্তু তিনি দলের সভাপতি হিসেবে পুরো আজাদ কাশ্মিরজুড়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। তিনি নিজের আসনটিতেও জয়লাভ করেন এবং মুসলিম লীগকেও (এন) ঐতিহাসিক সাফল্য এনে দেন। তবে ইফতেখার গিলানির কিছু সমর্থক দাবি করেন, আজাদ কাশ্মিরে মুসলিম লীগের (এন) সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে অন্য কেউ রয়েছেন। এ ‘অন্য কেউ’ মূলত মরিয়ম নওয়াজ, যিনি নিজেও দাবি করেন, আজাদ কাশ্মিরের জনগণ পাঞ্জাবে মুসলিম লীগের (এন) কর্মদক্ষতা দেখে ভোট দিয়েছেন।

প্রশ্ন হলো, মুসলিম লীগ (এন) যদি আজাদ কাশ্মিরে এতটাই জনপ্রিয় হতো, তবে সমস্ত রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করা সত্ত্বেও পুঞ্ছের সাতটি আসনে এখনো নির্বাচন হলো না কেন? মুসলিম লীগের (এন) পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ইফতেখার গিলানিকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর সিদ্ধান্ত দলের নেতা নওয়াজ শরিফ নিয়েছেন। কারণ তিনি আজাদ কাশ্মিরে নতুন কোনো মুখ পরিচিত করাতে চাচ্ছেন। নওয়াজ শরিফের যদি এই নতুন মুখটি এতটাই পছন্দ হয়ে থাকে, তবে তিনি নিজে ইফতেখার গিলানির পাশে বসে আজাদ কাশ্মিরের জন্য এই নতুন মুখের নাম ঘোষণা করলেন না কেন? নওয়াজ শরিফের ওপর অন্যান্য বিষয়ে সমালোচনা করা যেতেই পারে; কিন্তু ইফতেখার গিলানিকে আজাদ কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী বানানোর সিদ্ধান্তটি কোনোভাবেই তার নয়। আমার জানা মতে, শাহ গোলাম কাদির যখন খবর পেলেন, টেকনোক্র্যাট আসনে অ্যাসেম্বলি সদস্য হওয়া ইফতেখার গিলানিকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হচ্ছে, তখন তিনি তার নেতা নওয়াজ শরিফকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। সেই মেসেজে তিনি বলেন, পরপর দু’বার নির্বাচনে হেরে যাওয়া কোনো ব্যক্তিকে যদি আজাদ কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়, তাহলে এই সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেবেন না এবং তিনি মুসলিম লীগের (এন) পদ ছাড়তে বাধ্য হবেন। তবে একজন কর্মী হিসেবে তিনি দলের জন্য কাজ করে যাবেন।

এই ভয়েস মেসেজ শুনে নওয়াজ শরিফ শাহ গোলাম কাদিরকে ফোন করেন এবং জানতে চান, আপনাকে কে বলেছে যে, ইফতেখার গিলানিকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হচ্ছে? শাহ গোলাম কাদির অত্যন্ত সম্মানের সাথে উত্তর দেন, আমি আজাদ কাশ্মিরে আপনার দলের সভাপতি, আমার নবনির্বাচিত সহকর্মীরা আমাকে বলছেন, একজন টেকনোক্র্যাটকে প্রধানমন্ত্রী বানানো হচ্ছে এবং তার প্রতি আস্থা রাখা হচ্ছে। তার নেতা নওয়াজ শরিফ এই খবর তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং শাহ গোলাম কাদিরকে বলেন, আপনি আপনার ভয়েস মেসেজটি ডিলিট করুন। এরপর নওয়াজ শরিফ তাকে জিজ্ঞেস করেন, আজাদ কাশ্মির অ্যাসেম্বলির জন্য স্পিকার কাকে বানানো যায়? শাহ গোলাম কাদির চৌধুরী তারিক ফারুকের নাম প্রস্তাব করেন। ডেপুটি স্পিকারের জন্যও তিনি দু-তিনটি নাম দেন এবং এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নওয়াজ শরিফের ওপরই ছেড়ে দেন। শ্রদ্ধেয় নেতা শাহ গোলাম কাদিরকে মরিয়ম নওয়াজের সালামও পৌঁছান, যিনি সে সময় তার পাশেই বসে ছিলেন। কথা শেষ হয়ে গেল।

দুদিন পর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন সম্পন্ন হলো। এবার শাহ গোলাম কাদির এবং রাজা ফারুক হায়দারকে ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ডাকা হলো। আগে তো সমস্ত সিদ্ধান্ত নওয়াজ শরিফ নিচ্ছিলেন; কিন্তু এবার তাদের ডেকেছিলেন শাহবাজ শরিফ। শাহ গোলাম কাদির কম্পিত হৃদয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছালেন। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে শাহবাজ শরিফ ছাড়াও রানা সানাউল্লাহ, খাজা সাদ রফিক এবং আরো কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকে রানা সানাউল্লাহর পক্ষ থেকে যখন ইফতেখার গিলানিকে আজাদ কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী বানানোর সিদ্ধান্ত শোনানো হলো, তখন শাহ গোলাম কাদিরের আগেই রাজা ফারুক হায়দার এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করলেন। শাহ গোলাম কাদির বললেন, আপনি আমাকে প্রধানমন্ত্রী না বানান; কিন্তু আমাদের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষিত সহকর্মী আছেন, আপনি তাদের মধ্যে যেকোনো একজনকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দিন, আমি তাকেই ভোট দেবো। কিন্তু আমি কোনো অনির্বাচিত ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভোট দেবো না। শাহবাজ শরিফ শাহ গোলাম কাদিরকে রাজি করানোর জন্য বেশ চেষ্টা করলেন; কিন্তু তিনি কারো হাতের পুতুল হতে অসম্মতি জানালেন।

আজাদ কাশ্মিরে এই পরীক্ষা প্রথমবার করা হচ্ছে না। জেনারেল আইয়ুব খানও ১৯৬১ সালে কে এইচ খুরশিদকে সরদার ইবরাহিম ও সরদার কাইউমের বিপরীতে এক নতুন মুখ হিসেবে পরিচিত করান এবং আজাদ কাশ্মিরের প্রেসিডেন্ট বানান। কে এইচ খুরশিদ ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইনের ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন; কিন্তু কিছু দিন পরই এই পরীক্ষা ব্যর্থ হওয়ায় তাকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর বহু বছর পর ব্যারিস্টার সুলতান মাহমুদকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে বলা হয়েছিল, তিনি এক নতুন মুখ। তিনি দল তো বহু বদলেছেন; কিন্তু আজাদ কাশ্মিরের পরিস্থিতি বদলাতে পারেননি।

একটি বড় পার্থক্য হচ্ছে, কে এইচ খুরশিদ এবং ব্যারিস্টার সুলতান মাহমুদ নির্বাচনে জিতে এসেছিলেন। কিন্তু ইফতেখার গিলানি গত দু’টি নির্বাচনে হেরেছেন। তিনি আজাদ কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী তো হয়ে গেলেন এবং শাহ গোলাম কাদিরকে রাজি করাতে তার বাড়িতেও পৌঁছালেন। কিন্তু এখন তিনি পাকিস্তানি রাজনীতির জন্য এক বিপদের ঘণ্টা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির সেই দাবি আরো জোরদার হবে, যারা আজাদ কাশ্মিরের নির্বাচনকে ভুয়া বলে আখ্যা দিয়েছিল। এখন পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরাও শাহ গোলাম কাদিরের মতো নিজ নিজ এলাকায় কষ্ট করার বদলে ইফতেখার গিলানির মতো অন্য কাউকে খুশি করার পথেই হাঁটবেন। শাহ গোলাম কাদিরকে আজাদ কাশ্মিরের প্রেসিডেন্ট বানানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এই লেখা পর্যন্ত তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। গত কয়েক দিনে তিনি যে মর্যাদা ও সম্মান পাচ্ছেন, তা প্রধানমন্ত্রী হয়েও কখনো পেতেন না। আজাদ কাশ্মিরের নির্বাচন কমিশনে মুসলিম লীগ (এন) তার নামেই নিবন্ধিত। তার উচিত এই নিবন্ধনটি অত্যন্ত আদব ও সম্মানের সাথে নওয়াজ শরিফের হাতে তুলে দেয়া, কারণ এখন আজাদ কাশ্মিরে এই দলটির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শাহ সাহেব সাহস করুন এবং নওয়াজ শরিফকে এ কথাটিও জানিয়ে দিন, আজাদ কাশ্মিরে দুবার নির্বাচনে হারা একজন টেকনোক্র্যাটকে প্রধানমন্ত্রী বানোনার পর, এখন পাকিস্তানেও কোনো টেকনোক্র্যাটের আগমনের পথ সুগম হচ্ছে।

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ৩১ আগসট, ২০২৬ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব ahmadimtiajdr@gmail.com

লেখক : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট