বিশ্ব যখন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করছে, বাংলাদেশ সেখানে চিরচেনা পদ্ধতিতে শুধু জ্ঞানার্জন করে কোনোরকম টিকে থাকার লড়াই করছে। এখানে শিক্ষার সাথে দক্ষতা অর্জনের পথ অনেকটাই সীমিত। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে। একই সাথে দেশে কর্মক্ষেত্রের নানা স্তরে উচ্চাসনগুলোতে অন্য দেশের দক্ষ লোকদের বসাতে হচ্ছে। অন্যদিকে, বিদেশেও আমাদের যেসব জনশক্তি প্রতি বছর যাচ্ছেন, তারাও অদক্ষ হওয়ার কারণে কাক্সিক্ষত রেমিট্যান্স অর্জন করতে পারছেন না। এ অবস্থার অবসান কবে হবে, তা আমাদের জানা নেই। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বিষয়টি নিয়ে গভীর উপলব্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে না।
গণমাধ্যমে খবর, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ ছয় হাজার। এক দশক আগের তুলনায় যা প্রায় আটগুণ বেশি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স-২০২৫-এ চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮১ দেশের মধ্যে ৬৭তম। যেখানে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি। সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের কৌশলপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কোনো প্রশিক্ষণের সাথে যুক্ত নেই। আর জনশক্তি রফতানির তথ্য অনুযায়ী, বিদেশগামী কর্মীদের মধ্যে দক্ষ কর্মীর হার মাত্র সাড়ে ২৩ শতাংশ। স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ হিসেবে যাচ্ছেন প্রায় ৫৪ শতাংশের বেশি মানুষ। এই একটি কারণে ফিলিপাইন অনেক কম জনশক্তি রফতানি করে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি আয় করে।
দক্ষতা উন্নয়নে কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। এর মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন অন্যতম। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যার সাথে কর্মের কোনো সংযোগ নেই। একজন শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে কোন খাতে প্রবেশ করবে তা নির্দিষ্ট নয়। এই অবস্থা থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সগুলো এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ হয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করার পর অনায়াসে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ভিত্তিক অনার্স-মাস্টার্স কোর্সে সংযোজন-বিয়োজন করতে হবে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু শিক্ষিত নয়; বরং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।
বেকারত্বের হার অধিক হওয়ায় চাকরির বাজারে ঘুষ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি একটি ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বিগত শেখ হাসিনার শাসনামলে এই ব্যাধি মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। কিছু মানুষকে শিক্ষা, যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয়ভাবে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এমন অবস্থা যাতে আর কখনোই ফিরে না আসে, সেটি বর্তমান সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের পেশাজীবী সংগঠনগুলোর অধিক রাজনৈতিক দলের কর্মী না হয়ে অধিক পেশানির্ভর দক্ষ হয়ে উঠার জন্য কাজ করতে হবে।
জনসংখ্যা কোনো দেশের জন্য বোঝা নয়; বরং সম্পদ। আর জনসংখ্যাকে শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলার মাধ্যমে জনসম্পদে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের সময় এসেছে। এ ক্ষেত্রে আর অবহেলা নয়।