সহজে ব্যবসা করতে এলসির পাশাপাশি মূল্যসীমার বাইরে বাণিজ্য করা যাবে
নতুন আমদানি নীতি-২০২৬ জারি
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
- সর্বোচ্চ ৩৭৫ সিসি মোটর বাইক আমদানির সুযোগ
- নতুন আমদানি নীতির গেজেট প্রকাশ
ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহজ করতে ঘোষিত নতুন আমদানি নীতিমালায় ঋণপত্র বা এলসির পাশাপাশি এখন থেকে মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি করা যাবে। এভাবে পণ্য আমদানি করতে পারবেন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকরা। এই নীতিমালায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধান, প্রবাসী বাংলাদেশীদের শিল্পে বিনিয়োগের জন্য আমদানি সুবিধা এবং রফতানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
এর আওতায় ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ মিলবে। এ ছাড়া প্রবাসীদের অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়াও সহজ হবে। গত সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত নতুন আমদানি নীতির গেজেট প্রকাশ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার তা বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে পাঠানো হয়েছে। ২০২১-২০২৪ আমদানি নীতির মেয়াদ ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষ হলেও নতুন আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত আগের নীতিই কার্যকর ছিল।
এলসির বাইরে পণ্য আমদানির সুযোগ
নীতিমালা খতিয়ে দেখা যায়, আগের আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪-এ এলসি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ থাকলেও বিভিন্ন পণ্য ও খাতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা ও শর্ত ছিল। নতুন আদেশে সেই সুযোগ আরো বিস্তৃত করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রচলিত পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্য আনা হয়েছে। আগের নীতিতে বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা এলসি ছাড়া নির্দিষ্ট মূল্যসীমার মধ্যে পণ্য আমদানি করতে পারতেন। নতুন নীতিতে সেই মূল্যসীমা তুলে দিয়ে সেলস বা পারচেজ কনট্রাক্টের মাধ্যমে আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯-এ আমদানি ব্যবস্থাকে আধুনিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণ, রফতানি সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পের কাঁচামালের সহজলভ্যতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এলসি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ
নতুন নীতির অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো আমদানির অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি আরো নমনীয় করা হয়েছে। এলসির পাশাপাশি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ দেয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা ব্যবহার করা আমদানিকারকদের জন্য সহজ হবে।
২০২১-২০২৪ নীতিতেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এলসি ছাড়া আমদানির সুযোগ ছিল। তবে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পরিশোধ করে এলসি ছাড়া আমদানির বার্ষিক সীমা ছিল পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার। বিশেষ কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে আলাদা সীমাও ছিল।
নতুন নীতিতে এসব সীমাবদ্ধতার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে ব্যাংকিং চ্যানেলে এলসি খোলার বাধ্যবাধকতা কমিয়ে আমদানিকারক ও বিদেশী সরবরাহকারীর মধ্যে সরাসরি বাণিজ্যিক চুক্তির সুযোগ বাড়াতে।
ফ্রি ট্রেড জোন
নতুন আমদানি নীতিতে ফ্রি ট্রেড জোন ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও পুনঃরফতানির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। একই সাথে রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা আরো কার্যকর হবে।
আগের আমদানি নীতির তুলনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন। ২০২১-২০২৪ নীতিতে রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ডসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকলেও নতুন আদেশে বাণিজ্য ও লজিস্টিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউসের বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
প্রবাসীদের শিল্পে আমদানি সুবিধা
নতুন নীতিতে প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসী বাংলাদেশী’র সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত আধুনিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রবাসী বাংলাদেশীদের দেশে শিল্প ও বিনিয়োগে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
রফতানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা
নতুন নীতিতে রফতানি বহুমুখীকরণ ও উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্যের রফতানি বাড়াতে বিভিন্ন রফতানিমুখী শিল্পে বিনামূল্যে বা ‘ফ্রি অব কস্ট’ ভিত্তিতে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এ সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল দ্রুত সংগ্রহের সুযোগ বাড়লে রফতানিকারকদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে।
৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ
নতুন আমদানি নীতির আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো মোটরসাইকেল আমদানিতে ইঞ্জিনক্ষমতার সীমা বাড়ানো। ২০২১-২০২৪ নীতিতে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল। নতুন নীতিতে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।
ফলে নতুন নীতি কার্যকর হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মাঝারি ও উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেল সরাসরি বাংলাদেশে আমদানির সুযোগ বাড়বে। তবে স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর প্রতিযোগিতামূলক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আমদানি প্রক্রিয়ায় এইচএস কোডের গুরুত্ব
নতুন নীতিতে পণ্যের এইচএস কোড ও বর্ণনার মধ্যে অসামঞ্জস্য নিয়ে আমদানিকারকদের দীর্ঘদিনের জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নীতির খসড়া পর্যায়ে এইচএস কোডের বর্ণনাকে চূড়ান্ত ভিত্তি করার প্রস্তাব করা হয়েছিল, যাতে কোড ও পণ্যের বর্ণনার অসামঞ্জস্যের কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় হয়রানি ও বিলম্ব কমে।
আমদানি নীতির পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১-২০২৪ আদেশের মূল লক্ষ্য ছিল আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং রফতানিমুখী শিল্পকে সহায়তা করা। নতুন ২০২৬-২০২৯ আদেশে সেই ধারা আরো বিস্তৃত করে আমদানি অর্থায়ন, বিনিয়োগ, লজিস্টিকস, পুনঃরফতানি ও প্রবাসী বিনিয়োগকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিশেষ করে এলসির পাশাপাশি মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ ব্যবসায়ীদের জন্য বড় পরিবর্তন। এতে আমদানিতে সময় ও ব্যাংকিং-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা কমতে পারে। তবে এলসির বাইরে লেনদেন বাড়ার সাথে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ওভার বা আন্ডার-ইনভয়েসিং এবং অর্থ পাচার ঠেকাতে নজরদারির প্রয়োজনও বাড়বে।
নতুন নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের আমদানি ব্যবস্থাকে এলসিনির্ভর প্রচলিত কাঠামো থেকে আরো নমনীয়, চুক্তিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচর্চার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থার দিকে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
নতুন নীতির শুরুতেই এফটিএ, সেপা, ইপিএ, ইউনিলেটারাল অ্যাগ্রিমেন্ট ও বাইলেটারাল অ্যাগ্রিমেন্টের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তির দিকে এগোচ্ছে। সে বিবেচনায় এসব চুক্তির আওতায় আমদানি ব্যবস্থাকে সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন নীতিতে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) বা সেপা কার্যকর করলে নতুন আমদানি নীতির কাঠামোর সাথে সেগুলো সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে বলে আমদানি নীতি বলা হয়েছে।