রোহিঙ্গা ইস্যুকে বৈশ্বিক এজেন্ডায় সক্রিয় রাখার প্রত্যয় ১৬ মিশনের

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

ঢাকায় অবস্থিত ১৬টি দেশের মিশন রোহিঙ্গা ইস্যুকে বৈশ্বিক এজেন্ডায় সক্রিয় রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। সঙ্কটটি দশম বছরে পদার্পণ করায় তারা রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে। মিশনগুলোর মতে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যাতে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে না যায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিবৃতি স্বাক্ষরকারী মিশনগুলো হলো ব্রিটেন, কানাডা, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, ইতালি, জাপান, কসোভো, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন এবং সুইজারল্যান্ড।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে দলে দলে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রবেশের নয় বছর পরও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এই বার্ষিকী উপলক্ষে দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতি ও কষ্টের মুখে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের স্থিতিশীলতা, সাহস ও মর্যাদার প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই। একই সাথে প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

মিশনগুলো মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকারের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করলেও বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনের অনুকূলে নয় বলে মন্তব্য করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, দুঃখজনকভাবে, রাখাইনজুড়ে সঙ্ঘাত বাড়ছে এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তীব্র হচ্ছে। বাড়তে থাকা নিরাপত্তাহীনতা, বেসামরিক অবকাঠামোতে বিমান হামলা এবং ত্রাণ ও বাণিজ্যের ওপর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের অবরোধ মানবিক পরিস্থিতিকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলছে। এই অস্থিরতা বাংলাদেশ এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য অংশে আরো নতুন বাস্তুচ্যুতির জন্ম দিচ্ছে, যার ফলে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটছে। বর্তমান পরিস্থিতি স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একেবারেই অনুকূল নয়। প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে একটি কৌশলগত, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির প্রয়োজন। এর জন্য বাস্তুচ্যুতির মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা তৈরি করা এবং মিয়ানমারে বৃহত্তর শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। সফল প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলা প্রয়োজন, যা রাখাইনে তাদের ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং সমাজ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে।

কূটনৈতিক মিশনগুলো প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টির উপায় খুঁজতে বাংলাদেশের সাথে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এমন পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা সঙ্কটের ভবিষ্যৎ কেবল মানবিক সহায়তা বজায় রাখার ওপর নির্ভর করে না, বরং এই সহায়তা দেয়ার ব্যবস্থার উন্নতির ওপরও নির্ভর করে। মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশী ও শরণার্থী-পরিচালিত সংস্থাগুলোর ভূমিকা বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে মিশনগুলো সমর্থন জানায়। রোহিঙ্গাদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তগুলোর কেন্দ্রে অবশ্যই তাদের নিজেদের কণ্ঠস্বর থাকতে হবে।

অংশীজনের সাথে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বলেছেন, বাংলাদেশ আসন্ন জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতিত্বকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ জোরদার করতে চায়। এই সঙ্কট ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে এবং এর নিরাপত্তা ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জের জন্য আরো জোরালো বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি পুরোপুরি একটি রাজনৈতিক সমস্যা, এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু। এই সমস্যার সমাধান আমাদের রাজনৈতিকভাবে করতে হবে। রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সব অংশীজনের সাথে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আরো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়ার আশা করছে।