চট্টগ্রাম নগরী ও উপজেলাগুলোতে ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে অবাধে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ওষুধ প্রশাসন বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের চোখের সামনেই চলছে মানুষের জীবন-মরণের সাথে জড়িত এই অবৈধ কর্মকাণ্ড।

সহযোগী একটি দৈনিকের খবর অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর বেশির ভাগ ফার্মেসিতে ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হয়। বেশির ভাগ ওষুধের দোকান বা ফার্মেসির লাইসেন্স নেই। ওষুধ বিক্রেতারা এ সম্পর্কিত আইন সম্পর্কে ওয়াকেবহালও নয়। যেকোনো ফার্মেসিতে প্রশিক্ষণ পাওয়া ফার্মাসিস্ট রাখা বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ফার্মেসিতেই তা নেই। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে ভেজাল ও নকল ওষুধ জব্দ করে। কিন্তু আইন অনুযায়ী নিয়মিত মামলা করে খুব কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিছু আর্থিক জরিমানা করে অপরাধীকে ছেড়ে দেয়া হয়। এতে দণ্ডিত ব্যক্তি আবারো এই অবৈধ কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। অথচ আইনে নকল ওষুধ বিক্রি, মজুদ ও প্রদর্শনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। এই কঠোর আইন কার্যত প্রয়োগ করা হলে সামান্য সময়ের মধ্যেই এ ধরনের অপরাধ সমূলে উৎপাটন হওয়া সম্ভব।

মানতে হবে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা আছে। চট্টগ্রাম নগরীর দেড় কোটি মানুষের জন্য অনুমোদিত ফার্মেসি আছে সাত হাজার। এগুলোর তদারকির দায়িত্বে আছেন মাত্র দু’জন তত্ত¡াবধায়ক। আছে ওষুধ প্রশাসনের জনবলের চরম ঘাটতি। দরকারি সাজ-সরঞ্জামের অভাবও প্রকট। এমনকি আইন প্রয়োগকারীসহ ওষুধ প্রশাসনেরও ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩’ সম্পর্কে জানাশোনার ঘাটতি আছে। এটি একটি বিশেষ আইন এবং ওষুধ সংক্রান্ত অপরাধের মামলা এই আইনে করা উচিত সেটাও তারা জানেন না। তারা মামলা করেন সাধারণত বিশেষ ক্ষমতা আইনে। ওষুধ প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের এই অসচেতনতা অপরাধ জিইয়ে রাখতে সহায়ক হচ্ছে।

এর বাইরেও আছে সংশ্লিষ্টদের মানসিকতার সঙ্কট। অপরাধের শাস্তি হতে হবে এই বোধটাই অনেকের মধ্যে কাজ করে না। জরিমানা করে ছেড়ে দেয়ার পেছনে নিজেদের অনৈতিক স্বার্থ হাসিলের বিষয়টিও জড়িত। এ কারণেই ওষুধ সম্পর্কিত অপরাধে মামলা হয় কালেভদ্রে। একটি পরিসংখ্যান থেকে সেটি স্পষ্ট। চট্টগ্রামে ওষুধ আদালত প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৮৯ সালে। কিন্তু গত ৩৫ বছরে এ আদালতে মামলা হয়েছে মাত্র ১৫টি। ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১০ বছরে একটিও মামলা হয়নি। অথচ অপরাধের মাত্রা সীমাহীন। চট্টগ্রামের সাতটি থানায় ৩৫০টি ফার্মেসির মধ্যে ৩৪টি অবৈধ অর্থাৎ লাইসেন্স ছাড়াই চলছে। এটি ওষুধ প্রশাসনের জরিপের তথ্য। ফার্মাসিস্ট নেই এমন ফার্মেসির সংখ্যাও অর্ধেকের বেশি।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেকারি পণ্য তৈরি ও ফার্মেসিতে নকল ওষুধ বিক্রির দায়ে ছয় প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ ৩৭ হাজার টাকা জরিমানা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। অথচ নিয়মিত মামলায় আদালত ন্যূনতম দণ্ড দিলেও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ টাকা করে দণ্ড দিতে হতো। এভাবেই মামলা দায়ের না করে সুবিধা নেয়ার সুযোগ কাজে লাগান আইন প্রয়োগকারীরা।

এটি স্পষ্ট যে, কেবল সামান্য জরিমানা করে অপরাধ দূর হবে না। বরং ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩’ এর আওতায় কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মানুষের জীবন নিয়ে এই মারাত্মক অপরাধের অবসান ঘটানো সম্ভব নয়।