বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে নতুন ধরনের নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে এই নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরির সময় অতীত সরকারের উদাসীনতা ছিল। গতকাল প্রকাশিত নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি অস্ত্র, মাদক ও চোরাচালানের বিস্তৃত রুট তৈরি করে বাংলাদেশের বড় ধরনের ক্ষতি করছে। তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড চালানোর ও অর্থ উপার্জনের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে আমরা ব্যবহৃত হচ্ছি। এ বিষয়ে সময়মতো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি তাদের মোকাবেলায় এখনো জোরালো নজরদারি প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। সীমান্তের ভারতীয় অংশে নিয়মিত পুশইন, বাংলাদেশীদের হত্যা, মাদক চোরাচালান ও নানা ধরনের বৈরী আচরণের সাথে মিয়ানমার সীমান্তে ক্রমবর্ধমান অপতৎপরতা আমাদের নিরাপত্তা সঙ্কট বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির আবির্ভাব হয় ২০০৯ সালে। তারা রাখাইন জনগণের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগঠিত হয়। ২০২১ সালের পর মিয়ানমারের সামরিক জান্তার দুর্বলতার সুযোগে রাখাইনের বিশাল অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের সংহত করার পরিবর্তে আরাকান আর্মি সশস্ত্র মাফিয়া গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সীমান্ত, বন্দর ও বাণিজ্য পথের ওপর তারা প্রভাব বিস্তার করে। বিস্তৃত অঞ্চলকে একটি সামরিক নেটওয়ার্কের আওতায় এনে মাদক বিস্তার, অস্ত্রের চালান, মানবপাচার ও অবৈধ বাণিজ্যের মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করছে। এর শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের যুবসমাজ। বাংলাদেশকে তারা এক বিশাল ইয়াবার বাজারে পরিণত করেছে। তাদের সৃষ্ট যোগাযোগ কাঠামো ক্ষতিকর ইয়াবা পাচারের জন্য ব্যবহার হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে রাখাইন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের মাদক পাচার বহুগুণ বেড়েছে। ২০২৫ সালে চার কোটি ৩৫ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তারা ১৭টি রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশে মাদক পাচার করছে। সীমান্তের পাহাড়ি স্থলপথ, নাফ নদী এবং বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরকে পাচারের নিরাপদ রুট বানিয়েছে। রাখাইনের পালেতোয়া ও চিন রাজ্যের বনাঞ্চল দিয়ে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলিকদম এবং রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকা রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। মংডু ও বুথিডং অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নাফ নদীর বিভিন্ন পয়েন্টকে মাদক পাচারের স্পট বানিয়েছে। নৌযানে করে টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, লেদা ও উখিয়ার বিভিন্ন জায়গায় মাদক পৌঁছে দেয়া হয়। সবচেয়ে বেশি মাদক পাচার করছে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে। মিয়ানমার থেকে পাচার করা মাদকের ৮০ শতাংশ আসে সমুদ্র হয়ে। কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে গভীর সমুদ্র থেকে ইয়াবা উদ্ধার হচ্ছে। চোরাচালানে তারা নগদ লেনদেনের পাশাপাশি হুন্ডি, ক্ষুদ্র মোবাইল লেনদেন এবং অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
বিগত সরকার চরম অবহেলা করার ফলে আরাকান আর্মির অবৈধ কর্মকাণ্ড অবাধে চলেছে। এখন তা বন্ধ করতে বাংলাদেশকে অনেক বেশি তৎপর হতে হবে। মিয়ানমারের সাথে সীমান্ত নিñিদ্র নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে। দুর্গম পাহাড়ি পথগুলো বিজিবির নজরদারির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নাফ নদীর পাচার স্পটগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সমুদ্রের বিস্তৃত অঞ্চলে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সীমান্তে নিযুক্ত সব বাহিনীকে একযোগে কাজ করতে হবে।