দীর্ঘদিন পর দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ঘোষণা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ কিংবা আগামী বছরের শুরুতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। কিন্তু ইতোমধ্যে এই নির্বাচন ঘিরে ঢাকায় রাজনৈতিক খুনখারাবি শুরু হয়েছে। এ যেন আবার সেই পুরনো রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির চিত্র।
নয়া দিগন্তে গত রোববার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের অপরাধ জগৎ। রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভাড়াটিয়া কিলারদের। এসব কিলারের টার্গেট ও চোরাগোপ্তা হত্যার শিকার হচ্ছেন একের পর এক নেতাকর্মী। গত ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর মিরপুরে দুর্বৃত্তের এলোপাতাড়ি গুলিতে খুন হন যুবদলকর্মী ইউসুফ। স্থানীয় যুবদল নেতাদের দাবি, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদ ঘিরে ঘটেছে এসব হত্যার ঘটনা।
ঢাকা মোট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ছয় মাসে রাজধানীতে ১২২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর বেশির ভাগই রাজনৈতিক। শুধু ১৮ থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে ঢাকায় ইউসুফ ছাড়াও ভাসানটেকে কাউসার মোল্লা, সবুজবাগে ইবরাহিম পলাশ এবং হাজারীবাগে সাগর আহমেদ নামে এক যুবক হত্যার শিকার হন। এর মধ্যে ইবরাহিম পলাশের দুই হাতের কব্জি কেটে নিয়ে যায় খুনিরা। হত্যাকাণ্ডের বড় অংশই ঘটেছে চুক্তিভিত্তিক শুটারদের প্রকাশ্য ও চোরাগোপ্তা হামলায়।
গত সাড়ে ১৫ বছর পতিত আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে একচেটিয়া রাজত্ব করেছে। এ সময় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগে একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগের পতন হলেও দেশে রাজনীতির সেই পুরনো অপসংস্কৃতি পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এটি হতাশাজনকই শুধু নয়; উদ্বেগেরও বিষয়।
রাজনীতি জনসেবার অন্যতম মাধ্যম; কিন্তু জনসেবার পরিবর্তে রাজনীতি এখন পেশিশক্তি প্রদর্শন আর অর্থ বানানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফলে রাজনীতিতে খুনখারাবি বাড়ছে।
বিএনপির নিজ দলের মধ্যে একের পর হত্যাকাণ্ড ঘটছে; কিন্তু দলটি এসব বন্ধে দৃশ্যত অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। এসব অপরাধের পর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, দলটি শুধু তাদেরকে বহিষ্কার করেই দায় সারে। একসময় সে বহিষ্কার আদেশ তুলেও নেয়। কিন্তু একটি দলে যখন হরহামেশা হত্যার মতো চরম অপরাধ ঘটে তখন এগুলো বন্ধ করতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা দরকার। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শুধু বহিষ্কার কিংবা আইনের হাতে তুলে দিলেই হবে না, হত্যাকাণ্ড বন্ধে দলের বিশেষ কর্মসূচি থাকা দরকার।
রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগিদার হতে না হতে যারা নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করতে দ্বিধা করে না তারা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব বা ক্ষমতা পেলে জনগণের ওপর জুলুম-নির্যাতন করবে না তার কোনো নিশ্চিয়তা নেই। আওয়ামী লীগের জুলুমবাজি ফিরে আসবে না তা-ও কেউ বলতে পারে না।
ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে রাজনীতিবিদদের কাছে মানুষ শুদ্ধ রাজনীতির চর্চা দেখতে চায়। পেশিশক্তির পুরনো রাজনৈতিক বৃত্তের বাইরে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ দেখতে চায়। গণতান্ত্রিক সমাজে মানুষ কারো হাতে জিম্মি হতে চায় না কিংবা কারো পেশিশক্তির খবরদারিও পছন্দ করে না। আগামী দিনের ঢাকা সিটি করপোরেশন তথা সারা দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদদের মনোনয়ন দেবে এবং খুনি, সন্ত্রাসীদের দমনে কঠোর ভূমিকা নেবে, এটিই প্রত্যাশা।