মিসরে গত বছর নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন ঘিরে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সৃষ্ট তীব্র বিতর্ক ও উত্তেজনা এখনো চলছে। গত বছর মে মাসে সংসদ একটি নির্বাচনী আইনের সংশোধনী পাস করে। এই আইনে ‘ক্লোজড লিস্ট’ (বদ্ধ তালিকা) ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেখানে কোনো দল ৫০ শতাংশ ভোট না পেলে একটি আসনও পায় না। বিরোধীরা অভিযোগ তোলেন, এটি রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে সঙ্কুচিত করেছে এবং এটি মূলত সম্পদশালী ও রাষ্ট্রীয় প্রভাবসম্পন্ন দলগুলোকে সুবিধা দেয়ার জন্য করা হয়েছে।

নির্বাচনের ঠিক আগে মিসরের জাতীয় নির্বাচন কর্তৃপক্ষ (NEA) দেশের প্রধান বিরোধী জোট এবং বহু স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সামরিক পরিষেবা থেকে বাধ্যতামূলক অব্যাহতি পাওয়ার কারণ দেখিয়ে অযোগ্য ঘোষণা করে। বিরোধীদের দাবি, এটি প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সরকারের একটি রাজনৈতিক ফিল্টার, যার মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে সরকারপন্থী জোট নেশনস ফিউচার পার্টির (Nation’s Future Party) বিজয়ের পথ সুগম করা হয়। মিসরের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে আল-সিসির ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। এর আগে ২০১৯ সালে সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর থেকে বাড়িয়ে ছয় বছর করা হয়েছিল। এর ফলে সিসি ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার আইনি বৈধতা পান। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী দলগুলোর মতে, ২০২৫ সালের শেষের দিকে সরকারপন্থী দলগুলোর ব্যাপক সংসদীয় বিজয় মূলত নতুন একটি সংবিধান সংশোধনীর পটভূমি তৈরি করছে। নতুন পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো সিসিকে ২০৩০ সালের পরও অর্থাৎ চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দেয়া। সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পুনঃনির্বাচনের ধারা সংশোধনে কঠোর সীমাবদ্ধতা থাকলেও বর্তমান অনুগত সংসদের মাধ্যমে তা ভেঙে ফেলার আয়োজন চলছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্যেও কৌশলগত ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কারণে পশ্চিমা বিশ্বে মিসরের গুরুত্ব বেড়েছে। গত ২২ অক্টোবর ২০২৫ বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে প্রথম ঐতিহাসিক ইইউ-মিসর শীর্ষ সম্মেলন হয়। সম্মেলনে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তোনিও কস্তা এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন মিসরের প্রেসিডেন্ট আল-সিসির সাথে মিলিত হন। মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের মার্চে স্বাক্ষরিত কৌশলগত অংশীদরিত্ব চুক্তির বাস্তব রূপ দেয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিসরের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিশেষ করে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার রোধে মিসরকে ৭.৪ বিলিয়ন ইউরোর (প্রায় আট বিলিয়ন ডলার) একটি বিশাল আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ প্রদান করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান গাজা সঙ্কট এবং সুদান পরিস্থিতির কারণে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিসি সরকারকে অন্যতম প্রধান অংশীদার বিবেচনা করে। ফলে মিসরের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার বা একদলীয় নির্বাচন ব্যবস্থা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সিসি সরকার ইউরোপের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করে নিজের অবস্থান শক্ত করছে, আবার দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনী আইন ও সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ২০৩০ সালের পরেও ক্ষমতায় থাকার আইনি পথ তৈরি করছে।

প্রেসিডেন্ট সিসির ক্ষমতা ধরে রাখার আইনি প্রচেষ্টা ও সংবিধান সংশোধনের পরিকল্পনার বিপরীতে বিরোধী দল, ব্রাদারহুড এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সক্রিয় থাকা আইনি ও ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী দলগুলো (সিভিল ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট, আল-দস্তুর পার্টি) এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছে। বিরোধীরা সিসির এই উদ্যোগকে দেশের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

২০১৩ সাল থেকে নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুড বর্তমানে মূলত নির্বাসন থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ জারি রেখেছে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ মাঝে মধ্যে মিসরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সঙ্কুুচিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। কিন্তু সিসির ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার বিষয়ে তারা তেমন উচ্চবাচ্য বা কড়া কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে বিরত রয়েছে। পশ্চিমাদের কাছে মিসরের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গাজা সঙ্কট ও সুদান যুদ্ধে মিসরের মধ্যস্থতা এবং ইউরোপে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার রোধে সিসি সরকারের কড়া অবস্থানের কারণে পশ্চিমা বিশ্ব সিসির আজীবন ক্ষমতায় থাকার আয়োজন মুখ বুজে সহ্য করছে। যা প্রমাণ করে, পশ্চিমারা ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, সিসির অধীনে মিসরের স্থিতিশীলতাকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিসি সরকারকে অন্যতম প্রধান অংশীদার বিবেচনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসা অবৈধ অভিবাসীদের বিশাল অংশ উত্তর আফ্রিকা হয়ে আসে। সিসি সরকার তার সীমান্ত ও জলসীমায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ইউরোপ অভিমুখে অভিবাসীর ঢল সফলভাবে আটকে দিচ্ছে। গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ এবং সুদানের গৃহযুদ্ধে মিসর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। হামাস, ইসরাইল এবং পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার জন্য সিসি সরকারই প্রধান মধ্যস্থতাকারী। মিসর তার ভূমধ্যসাগরীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানি করে ইউরোপের জ্বালানি ঘাটতি পূরণে বড় ভূমিকা রাখছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এবং বিশেষ করে ইউরোপের বেশির ভাগ পণ্য সুয়েজ খাল হয়ে যাতায়াত করে। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সিসি সরকারের শক্তিশালী সামরিক নিয়ন্ত্রণ ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। মিসরের সিনাই অঞ্চলসহ উত্তর আফ্রিকায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) এবং অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সিসি সরকার কঠোর সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। মিসরে উগ্রবাদের বিস্তার রোধ করা ইউরোপের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনে অত্যন্ত জরুরি। ১০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশ মিসর ইউরোপীয় অস্ত্র, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত পণ্যের বিশাল বাজার। সিসির মেগা-প্রজেক্টগুলোতে (যেমনÑ নতুন প্রশাসনিক রাজধানী, আধুনিক রেলওয়ে) বিভিন্ন ইউরোপীয় কোম্পানি বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করছে।

বহু বছর ধরে চলে আসা রুটির দামে আসলেই একটি বড় এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে প্রায় সাত কোটিরও বেশি মানুষ (জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ) সরকারের দেয়া বিশেষ রেশন কার্ডের মাধ্যমে অত্যন্ত সস্তায় ঐতিহ্যবাহী ‘বালাদি’ (Baladi) রুটি কিনতে পারত। ভর্তুকিযুক্ত এই রুটির দাম ছিল প্রতি পিস পাঁচ পিয়াস্টার। ২০২৪ সালের ১ জুন সিসি সরকার সেটি বাড়িয়ে ২০ পিয়াস্টার করে। ১৯৮৮ সালের পর রুটির সরকারি মূল্যে এটিই ছিল প্রথম এবং নজিরবিহীন বৃদ্ধি। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সিসির অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনেনি; বরং জীবনযাত্রার খরচ আরো বাড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে আট বিলিয়ন ডলারের ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে মিসর সরকারকে বাজেট ঘাটতি কমাতে এবং বড় অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি ক্রমান্বয়ে তুলে নেয়ার নির্দেশ দেয়। মিসর বিশ্বের বৃহত্তম গম আমদানিকারক দেশ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে গমের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যাওয়ায় সরকারের পক্ষে এত বিশাল ভর্তুকি দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। যাদের রেশন কার্ড নেই বা যারা খোলাবাজার থেকে সাধারণ রুটি কেনেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। খোলাবাজারে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কারণে রুটির দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম্প্রতি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সরকার বেসরকারি বেকারিগুলোর জন্য একটি সর্বোচ্চ মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দেয়। বর্তমানে খোলাবাজারে একটি ৮০ গ্রামের সাধারণ রুটির সর্বোচ্চ দাম দুই মিসরীয় পাউন্ড। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী রুটির দাম নিয়ে কারসাজি করলে তাকে সরাসরি সামরিক আদালতে বিচার করা হবে বলে আইন করা হয়েছে।

মিসরের বিরোধী দলগুলো আন্তঃদলীয় সহযোগিতার ওপর জোর দিলে তারা নিছক দর্শক থেকে অংশগ্রহণকারীতে রূপান্তরিত হতে পারে। সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মনোনয়ন, নাগরিক সমাজের ইস্যুগুলোর জন্য প্রচারণা এবং ইশতেহার প্রণয়নের ক্ষেত্রে অর্থবহ সমন্বয় বিরোধীদের মধ্যে একটি গণতান্ত্রিক মনোভাব তৈরি করতে পারে, যা বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। দলগুলোর মধ্যে মতাদর্শের পার্থক্য অপ্রতিরোধ্য বাধা নয় এবং ভবিষ্যতে এটি কমতে পারে, যেমনটি মোবারক যুগে হয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির মিসরে আরো ১০ বছর অর্থাৎ ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার আয়োজন সফল হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তার সফল হওয়া বা ব্যর্থতার ঝুঁকি সমান শক্তিশালী। সংসদ সম্পূর্ণ সিসি অনুগত দলগুলোর দখলে। প্রধান বিরোধী দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে অনেকটা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। সিসির বিকল্প হিসেবে দাঁড়ানোর মতো কোনো সুপরিচিত বেসামরিক নেতা এই মুহূর্তে মিসরে নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিসিকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো মিসরের শাসন ক্ষমতায় অস্থিতিশীলতা চায় না। ফলে সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ বাড়ানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।

সিসির বড় শত্রু কোনো রাজনৈতিক দল নয়; বরং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি। মুদ্রাস্ফীতি, ঋণের বোঝা এবং রুটি-জ্বালানির আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে। ক্ষুধার্ত মানুষ শ্রীলঙ্কার মতো গণ-অভ্যুত্থান শুরু করলে সিসির সব আইনি আয়োজন ভেঙে পড়বে। জুনিয়র অফিসার এবং সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জীবনযাত্রার মান নিয়ে যে সুপ্ত ক্ষোভ রয়েছে, তা যেকোনো বড় সঙ্কটে বিস্ফোরিত হতে পারে। যদি কখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে সেনাবাহিনীর শীর্ষ জেনারেলরা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সিসিকে মাইনাস করে নতুন কোনো সামরিক নেতাকে সামনে নিয়ে আসতে পারেন। মিসরের ইতিহাস বলে, তীব্র অর্থনৈতিক অসন্তোষের মুখে যেকোনো শক্তিশালী স্বৈরশাসন মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে (হোসনি মোবারকের পতন)।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার