শারমিন, আমাদের প্রতিবেশী। ঘরে বসে টেইলারিং করেন। আমার স্ত্রীর পোশাক-আশাকও তৈরি করে দেন। তার স্বামী মিঠুন মিয়া মাছের ব্যবসায় করেন। সেই সাথে অটোরিকশাও চালান। শারমিন-মিঠুনের ঘরে এক সন্তান। আরো এক সন্তান এসেছিল সাড়ে পাঁচ মাস আগে। নাম রাখা হয়েছিল সাফওয়ান। শুক্রবার সাফওয়ান নামের এ শিশুর মৃত্যু হয়েছে কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজে। পরিবারের অভিযোগ, এর পেছনে আছে চিকিৎসায় অবহেলা।

বৃহস্পতিবার শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে অক্সিজেন দেয়া হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে সেটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। তখন অক্সিজেন সরবরাহ ঠিক করে দিতে নার্সদের সহযোগিতা চান তারা। কিন্তু দায়িত্বে থাকা সেবিকারা মধ্যরাতে সেবা দিতে অনীহা দেখান। শিশুটির খারাপ অবস্থা জানিয়ে বারবার আকুতি জানান স্বজনরা। সেবিকাদের মন গলেনি। সাফওয়ানের শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। সকাল হয়। চিকিৎসকের কাছে যান শারমিনের স্বজনরা। শুরুতে সাড়া মেলেনি। পরে স্বজনরা চেঁচামেচি শুরু করেন। এতে (সম্ভবত বিরক্ত হয়ে) এক চিকিৎসক সাফওয়ানকে দেখতে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে সাফওয়ান চলে গেছে।

এ খবর গণমাধ্যমে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

দেখা যাক, তদন্তে কী বের হয়ে আসে? আসলে ভুলটা শারমিনের হয়েছে! পাঁচ-ছয় বছরের আকাক্সক্ষার পর সাফওয়ান তাদের ঘরে আসে। তাকে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা ঠিক হয়নি। বেসরকারি হাসপাতালে থাকলে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হতো সাফওয়ানকে!

আমার স্ত্রীকেও একবার এই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। তখন আমার সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়ে সেবাগুলো নিশ্চিত করাতে হয়েছে। কিন্তু যারা সাংবাদিক নন? যাদের বিশেষ কোনো পরিচয় নেই? তারা কী করবেন? তাদের আসলে সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়াটা ভুল!

Hos-animation

সরকারি হাসপাতালে কী দেখা যায়? রোগীকে এক ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে নিতে হলে ট্রলির জন্য বকশিশ দিতে হয়। রোগী যত জটিল হোক, বকশিশ না দিলে সেবিকাদের মন গলে না। মুমূর্ষুদের সাথেও দুর্ব্যবহার করেন ট্রলিম্যানরা। রোগীর মৃত্যু হলে মুসিবতের ওপর মুসিবত! বকশিশ ছাড়া লাশ নাড়ানো যায় না। দরজায় দরজায় বকশিশ!

হাসপাতালের সেবক ও সেবিকাদের মুখে হাসি থাকে না। চিকিৎসকদের মুখ গোমড়া। অথচ সেই একই চিকিৎসক বেসরকারি কোনো হাসপাতালে অথবা বিকেলে নিজের চেম্বারে বসলে সেবার কোয়ালিটি বাড়িয়ে দেন।

কেবল চিকিৎসক আর সেবিকাদের খলনায়ক বানিয়ে দায় ঝেড়ে ফেলার সুযোগ নেই। আসলে আমাদের হাসপাতালগুলোতে কাজের পরিবেশই এমন। একজন সৎ মানুষও ধীরে ধীরে সিস্টেমের দাস হয়ে ওঠেন। এই সিস্টেমের খেসারত দিতে হচ্ছে শারমিন ও মিঠুনদের।

স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার খেসারত সবাইকে দিতে হচ্ছে। এমনকি স্বয়ং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রীকেও। সকালে ঘুম ভাঙার পর তিনিও তো দাঁত ব্রাশ করেন। যে ফেনায়িত টুথপেস্ট দিয়ে তিনি দাঁত পরিষ্কার করছেন, সেই টুথপেস্টের সাথে তার পেট আর রক্তে গিয়ে জমা হচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা। বাজারে প্রচলিত দেশী-বিদেশী ২৬ ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার খবর সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এ নিয়ে হাইকোর্টে রিটও হয়েছে।

মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতের জঞ্জাল আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর কর দরকার। কোনো উদ্যোগ যে নেয়া হচ্ছে না, সেটি নয়। কিন্তু উদ্যোগগুলো একটু ভেবেচিন্তে নিতে পারলে টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিছু দিন আগে একটি সংবাদমাধ্যমে এসেছে স্বাস্থ্য খাতের হযবরল অবস্থার চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালের জন্য নতুন নতুন ভবন বানাচ্ছে সরকার। চকচকে চাদর দিয়ে সাজানো হচ্ছে শয্যা। কিন্তু সেগুলোতে সেবা দেয়ার মতো চিকিৎসক নেই, সেবিকা নেই। এমনকি পরিচ্ছন্নতাকর্মীও নেই! স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাজার হাজার পদ খালি পড়ে আছে দিনের পর দিন। রোগীরা কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। অনেক সময় বাধ্য হয়ে হাসপাতালের ট্রলিম্যান, ঝাড়ুদার জোগাড় করতে হয় বাইরে থেকে। তখন তাদের উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠে রোগীদের জিম্মি করা। এক পর্যায়ে জিম্মি করাই নিয়মিত রীতি হয়ে ওঠে। যেসব রোগী জিম্মিদশা থেকে বেরিয়ে আসতে চান, তাদের হেনস্তার শেষ থাকে না। দলবদ্ধভাবে হামলে পড়া হয় তাদের ওপর। স্বজনরা তাদের সাথে কথা বলতে গেলে, একটু সময় চাইলে সেটাকে ‘অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বজনদের গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। এসব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে হইচই হয়। প্রতিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। তারপর সব মিটে যায়। কিন্তু মিটমাট হয় কীভাবে?

প্রভাবশালীদের মাধ্যমে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের উচ্চপদস্থরা। আর প্রভাবক হিসেবে থাকেন সাংবাদিকরা। তারাই সত্য প্রকাশ করে প্রভাবশালীদের ওপর চাপ তৈরি করেন।

শারমিনের সন্তান সাফওয়ান হারানোর খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে তদন্ত কমিটি করতে বাধ্য হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমাদের দেশে সাধারণ যে সংস্কৃতি চলে এসেছে, সে অনুযায়ী ধারণা করা যায় ইতোমধ্যেই হয়তো দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন অভিযুক্তরা। তারা হয়তো ওই আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করতে চাইবেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ‘ম্যানেজ’ করতে চাইবেন। স্থানীয় সাংবাদিকদের কারো দিকে টোপ ফেলবেন।

হতে পারে অভিযুক্তরা ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। দৌড়ঝাঁপে সফল হতে পারেন তারা! তারপর কী হবে? তদন্তর কোনো শেষ হবে না। অথবা গুরুপাপে লঘুদণ্ড দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়া হবে।

ধামাচাপা না হয় দেয়া হলো। এক শারমিনের সন্তান সাফওয়ান গেল। কিন্তু কিছু দিন পরই তো শোনা যাবে আরেক শারমিনের ঘটনা। তখন?

তখনো হয়তো একই প্রক্রিয়া চলবে। আসলে এই প্রক্রিয়াতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। প্রক্রিয়ার এই চেনটা থামিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি হয়ে উঠেছে, মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

আপনি শুরু করতে পারেন টুথপেস্ট থেকেই। টুথপেস্ট যেন স্বাস্থ্যকর হয় সেটা নিশ্চিত করতে যা দরকার, সেগুলো করতে পারেন। কেবল টুথপেস্ট নয়, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য আর কী কী হুমকি, সব চিহ্নিত করার কাজ শুরু করতে পারে আপনার মন্ত্রণালয়। তারপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে সেগুলো পাঠানো যেতে পারে। আর আপনার স্বাস্থ্য খাতকে একদম গোড়া থেকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগও নিতে পারে। একসাথে সব হয়ে যাবে বলছি না। তবে সাময়িক বা জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকম করে ফুটো বন্ধ করার চিন্তা মাথায় রাখা যাবে না।

টেকনাফের হাসপাতালের জন্য ট্রলি বা অক্সিজেন সিলিন্ডান কেনার অনুমতি যদি রাজধানীর ডিজি অফিস বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিতে হয়, তাহলে দুর্নীতি আর ধীরগতি কমানো সম্ভব হবে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে বছর শেষে বাজেট ফেরত যাওয়ার শঙ্কা কমে যাবে। বাজেট চুরির পথও বন্ধ হবে।

স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ করা যায় কি না, ভেবে দেখা যেতে পারে। সব শূন্য পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করা জরুরি।

চিকিৎসকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের আকর্ষণীয় প্রণোদনা দেয়াও প্রয়োজন। গ্রামে বা দুর্গম এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী ডাক্তারদের বিশেষ ভাতা, নিরাপত্তা ও চমৎকার আবাসন সুবিধা দেয়া যেতে পারে। একই সাথে বায়োমেডিক্যাল হাজিরা এবং মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে- সরকারি ডিউটির সময়ে কোনো চিকিৎসক যেন ফাঁকি দিতে না পারেন।

প্রাইভেট হাসপাতাল আর ক্লিনিকগুলো যাতে ইচ্ছামতো ফি আর টেস্টের নামে ডাকাতি করতে না পারে, এর জন্য কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও নির্দিষ্ট ফি বেঁধে দেয়া যেতে পারে। দরিদ্র রোগীদের জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা সরকারি খরচে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে করিয়ে নেয়ার সুবিধা তৈরি করতে হবে।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

smmoshahid@gmail.com