এম আবু হোরায়রাহ
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে দেশের উৎপাদন খাত, বাণিজ্য এবং সাধারণ নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক গতি থমকে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ দীর্ঘস্থায়ী ও ক্রমবর্ধমান গ্যাস সঙ্কট। এই সঙ্কট আর কেবল সাময়িক জ্বালানি ঘাটতির স্তরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন দেশের শিল্প খাত, রফতানি আয়, কর্মসংস্থান এবং প্রতিটি সাধারণ পরিবারের দৈনিক জীবনযাত্রার ওপর বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করেছে।

১. জাতীয় অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদনে বিপর্যয়ের ছায়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূলভিত্তি হলো আমাদের উৎপাদনমুখী শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরী পোশাক, টেক্সটাইল, গ্লাস, সিরামিক, রি-রোলিং মিল ও চামড়া শিল্প। এসব খাতে উৎপাদন সচল রাখতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত চাপের প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনীয় গ্যাসের অর্ধেকেরও কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কারখানাগুলোতে ভারী যন্ত্রপাতি ও ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট হয় বন্ধ রাখতে হচ্ছে, না হয় ক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ক্ষমতায় চালাতে হচ্ছে।

গ্যাসের নিম্ন চাপের কারণে প্রস্তুতকৃত পণ্যের গুণগত মান বিনষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। অনেক কারখানা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচে ডিজেল বা অন্যান্য ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে, যা বিশ্ববাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্দিষ্ট সময়ে শিপমেন্ট সরবরাহ না করতে পারায় একের পর এক রফতানি আদেশ বাতিল হচ্ছে বা অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনায়। লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

২. নগরজীবন ও গৃহস্থালির চরম ভোগান্তি : পুরান ঢাকার অভিজ্ঞতা
শিল্প খাতের পাশাপাশি এই গ্যাস সঙ্কট দেশের সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে অবর্ণনীয় ভোগান্তির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের পুরনো ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমি নিজে পুরান ঢাকার বংশাল থানার অন্তর্ভুক্ত কসাইটুলি এলাকার একজন স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে অত্যন্ত দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে এই চরম বাস্তবতা প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করি।

কসাইটুলিসহ পুরান ঢাকার বিশাল বিস্তৃত এলাকার পরিবারগুলোতে রান্নার প্রধান সময়ে চুলায় বিন্দুমাত্র গ্যাস থাকে না। সকাল-দুপুর কিংবা সন্ধ্যার যে সময়ে পরিবারের জন্য খাবার প্রস্তুত করার কথা, তখন চুলাগুলো একেবারে মৃত পড়ে থাকে। মাঝে মধ্যে গভীর রাতে যখন সামান্য গ্যাস আসে, তার চাপ এতই ক্ষীণ থাকে যে তা দিয়ে স্বাভাবিক রান্না কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। ফলে প্রতিটি পরিবারকে প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদা মেটাতে নাভিশ্বাস তুলতে হচ্ছে।

বিকল্প হিসেবে পরিবারগুলোকে ব্যয়বহুল এলপিজি সিলিন্ডার, ইলেকট্রিক ইনডাকশন চুলা কিংবা কেরোসিনের স্টোভের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য মাসের নির্ধারিত বাজেটের বাইরে এটি এক বিশাল অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা। এ ছাড়া পুরনো ভবনগুলোতে সিলিন্ডার গ্যাসের অনিরাপদ ব্যবহার অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় ধরনের দুর্ঘটনার মারাত্মক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৩. সঙ্কট সমাধানের টেকসই ও কার্যকর উপায়
বর্তমান সঙ্কট মোচনে সরকারকে দ্রুত এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জোড়াতালি দেয়া নীতি বা সাময়িক আমদানিনির্ভর সমাধান দিয়ে এই গভীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সরকারের উচিত অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা :

দেশীয় অনুসন্ধান ও উত্তোলন জোরদার : বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর ব্লকে বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে খনিজ অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং স্থলভাগের অনাবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে ড্রিলিং শুরু করা।

পুরনো কূপ সংস্কার (Workover) : দেশে বিদ্যমান বহু পুরনো কূপ উপযুক্ত সংস্কার ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে পূর্ণ সম্ভাবনায় ব্যবহৃত হচ্ছে না। সেগুলোতে থার্ড-পার্টি রি-ড্রিলিং ও ওয়ার্কওভার করে দ্রুত উত্তোলন বাড়ানো সম্ভব।

অবৈধ সংযোগ ও সিস্টেম লস রোধ : পাইপলাইনের দুর্বলতা ও অবৈধ সংযোগের কারণে যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয়, তার বিরুদ্ধে কঠোর ও জিরো-টলারেন্স অভিযান চালাতে হবে। প্রি-পেইড মিটার স্থাপন দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোযোগ : ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের প্রসার ঘটাতে হবে, যাতে শিল্প ও বিদ্যুতের গ্যাস চাহিদা কমানো যায়।

উপসংহার : জ্বালানি নিরাপত্তা হলো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। গ্যাসের অভাব যদি এখনই দূর করা না যায়, তবে তা শিল্প খাতে ধস নামাবে, যা পরবর্তীতে জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে।

নীতিনির্ধারকদের কাছে একটাই আবেদন, পুরান ঢাকাসহ সারা দেশের গৃহস্থালি ও শিল্পের গ্যাস সঙ্কট নিরসনে তাৎক্ষণিক কৌশলগত ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

লেখক : সাবেক সহ-সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)