‘দ্য স্টোরিজ’: ভালোবাসার ঠিকানা স্বদেশ

Printed Edition
bino-1
‘দ্য স্টোরিজ’: ভালোবাসার ঠিকানা স্বদেশ

আলমগীর কবির

মিসরের নির্মাতা আবু বকর শওকির নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য স্টোরিজ’ মূলত তার মাতৃভূমির প্রতি এক আন্তরিক ভালোবাসার নিবেদন। ষাট থেকে আশির দশক- তিন দশকজুড়ে বিস্তৃত এই গল্পে ব্যক্তিজীবনের উত্থান-পতনের সাথে সমান্তরালে উঠে এসেছে একটি দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস। গত সপ্তাহে টরন্টো আরব ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে প্রদর্শিত হয় চলচ্চিত্রটি।

গল্পের কেন্দ্রবিন্দু আহমাদ (আমির এল-মাসরি)। কায়রোর এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী তরুণ। তার স্বপ্ন আন্তর্জাতিক মানের কনসার্ট পিয়ানোবাদক হওয়ার। কিন্তু অস্ট্রিয়ার তরুণী এলিজাবেথের (ভ্যালেরি পাচনার) সাথে চিঠির মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক সম্পর্ক তার জীবনের গতিপথই বদলে দেয়।

এরপর গল্প এগোয় দুই মহাদেশ পেরিয়ে। প্রেম, বিচ্ছেদ, হাসি, বেদনা ও জীবনের নানা বাঁক একে একে ধরা দেয় পর্দায়। রাজনৈতিক ভাষণ, ফুটবল ম্যাচ এবং রেডিও সম্প্রচারের আর্কাইভ ফুটেজের দক্ষ ব্যবহার চলচ্চিত্রটিকে শুধু একটি পারিবারিক গল্পে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং মিসরের ইতিহাসকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে।

আহমাদের পরিবারের প্রাণকেন্দ্র তার মা ফাইরুজ। নেলি করিমের অভিনয় চরিত্রটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। সংসারের ভার কাঁধে নিয়ে তিনি যেমন পরিবারকে আগলে রাখেন, তেমনি তার আবেগ, মমতা ও দৃঢ়তা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বাবা সন্ধ্যা কাটান টেলিভিশনের সামনে, চারপাশে আত্মীয়স্বজনের আড্ডা। দুই ভাইয়ের দুষ্টুমি আর খুনসুটি মিলিয়ে পরিবারটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।

তবে চলচ্চিত্রটি সব জায়গায় সমান শক্তিশালী নয়। এলিজাবেথ চরিত্রে ভ্যালেরি পাচনার আন্তরিক অভিনয় সত্ত্বেও চরিত্রটি পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। একটি ইউরোপীয় নারীর মিসরীয় পরিবারে এসে মানিয়ে নেয়ার সাংস্কৃতিক সঙ্ঘাত আরো গভীরভাবে দেখানো যেত। কিন্তু নির্মাতা সেটিকে কয়েকটি সংলাপ ও পরিচিত শাশুড়ি-বউমার দ্বন্দ্বের ইঙ্গিতেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

কিছু দৃশ্যে আবু বকর শওকি অতিরিক্ত আবেগের আশ্রয় নিয়েছেন বলেও মনে হয়। রাষ্ট্রপতির সাথে ছবি তোলার পুনরাবৃত্ত প্রসঙ্গ কিংবা ‘দুর্নীতি’ শব্দকে ঘিরে কয়েকটি ঘটনার উপস্থাপনা কিছুটা গতানুগতিক। বিমানবন্দরের বিদায়ের দৃশ্যটিও দর্শক সহজেই অনুমান করতে পারেন।

তবু এসব সীমাবদ্ধতা চলচ্চিত্রটির আবেদন নষ্ট করতে পারেনি; বরং ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ছবিটিকে স্মরণীয় করে তোলে। ইংরেজি উচ্চারণে আরবদের ‘পি’ ও ‘বি’ অক্ষর নিয়ে মজার বিভ্রান্তি, এলিজাবেথকে নিয়ে দুই ভাইয়ের ঠাট্টা, আহমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীর ইচ্ছাকৃতভাবে ‘পিয়ানো’কে ‘বিয়ানো’ বলা, জামালেকের ফুটবল ম্যাচ ঘিরে পরিবারের উচ্ছ্বাস কিংবা নিজের রান্নার রেসিপি নিয়ে ফাইরুজের একরোখা ভালোবাসা- এসব দৃশ্য ছবিতে এনে দিয়েছে প্রাণ।

অভিনয়ের দিক থেকে নেলি করিম ও আমির এল-মাসরি নিঃসন্দেহে সবচেয়ে উজ্জ্বল। তাদের স্বাভাবিক ও সংযত অভিনয় চলচ্চিত্রটিকে আবেগের জায়গায় আরো বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

সব মিলিয়ে ‘দ্য স্টোরিজ’ কেবল একজন মানুষের জীবনগাথা নয়; এটি একটি দেশের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের টানাপড়েনের দলিল। ছবিটি যেমন দেখায়, মানুষ কেন নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে চায়, তেমনি শেষ পর্যন্ত এটিও মনে করিয়ে দেয়- সব হিসাব-নিকাশের শেষে হৃদয়ের ঠিকানা থেকে যায় নিজের শেকড়েই। আর সেই কারণেই নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আহমাদ ফিরে আসে নিজের দেশে, গড়ে তোলে নতুন জীবন। হয়তো সেটি তার স্বপ্নের জীবন নয়; কিন্তু সেটিই তার আপন ঠিকানা।