বাংলাদেশের উর্বর মাটিতে সোনা ফলে। আর তাই কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির এই দেশে কৃষক ১২ মাস ফসল ফলান। কিন্তু বাজারে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন আবারো ফসল ফলাতে।
এবার শীতকালে এবং রমজানের সময় সবজি, বিশেষ করে টমেটো, ফুলকপি, বেগুন, লাউ ইত্যাদির দাম অন্য বছরের চেয়ে কম ছিল। এতে ভোক্তারা স্বস্তি পেলেও উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সম্প্রতি সবজির দাম কিছুটা বাড়লেও শীত ও রোজার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
একটি সহযোগী দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্য মতে, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি টমেটোর যৌক্তিক মূল্য হওয়া উচিত ২৬ টাকা। কিন্তু রমজান মাসে খুচরা বাজারে টমেটো বিক্রি হয়েছে ১২ থেকে ১৫ টাকায়। একইভাবে কাঁচামরিচের যৌক্তিক পাইকারি মূল্য হওয়া উচিত প্রতি কেজি ৪৫ টাকা। রমজানে খুচরায় তা বিক্রি হয়েছে ৪০ টাকা কেজি দরে। মিষ্টিকুমড়ার যৌক্তিক মূল্য ২৪ টাকার স্থলে বিক্রি হয়েছে ২০ টাকায়।
কৃষিপণ্য বিপণন বিধিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন সময় যৌক্তিক মুনাফা কত হবে, তা ঠিক করে দেয়ার কথা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের। তাদের অধীনে বাজারভিত্তিক আলাদা কমিটি থাকার কথা। সেই কমিটি কাগজে-কলমে থাকলেও কৃষকের স্বার্থে তাদের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
কৃষক সবসময় তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য চায়। কিন্তু ভোক্তার আগ্রহ কম মূল্যে। আবার ব্যবসায়ীরা চান বেশি মূল্যে ব্যবসা করতে। কৃষকের পণ্যের এই ত্রিমুখী অবস্থান সবসময় দেখা যায়।
উৎপাদন মৌসুমে পণ্যের দাম কম থাকে। কিন্তু উৎপাদন ছাড়া অন্য মৌসুমে দাম বেশি হয়। এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এর থেকে কৃষক ও ভোক্তা উভয়কে রক্ষা করতে হবে। এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে।
ভারতে সরকার উৎপাদন মৌসুমে পণ্য কিনে মজুদ করে। পরে মৌসুম চলে গেলে পণ্যগুলো বাজারে ছাড়ে। এতে করে বাজারে সেই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমাদের দেশে সরকারের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশে আলুর জন্য হিমাগার থাকলেও অন্যান্য সবজির পচনরোধে কোনো হিমাগার নেই। তাই কৃষক যত দ্রুত সম্ভব পচনশীল কৃষিপণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। দ্রুত পচনশীল পণ্য সংরক্ষণে হিমাগার বাড়ানো বিষয়ে ভাবা যেতে পারে।
কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, মানসম্মত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে দেশে প্রতি বছর ২০ থেকে ৪৪ শতাংশ শাকসবজি এবং ফলমূল নষ্ট হয়, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ২৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
কৃষকের পণ্য বাজারজাতের জন্য সরকারের নানা উদ্যোগ থাকলেও অবহেলার কারণে কৃষক সেগুলোর সুফল ভোগ করতে পারছে না।
কৃষকের পণ্য অনলাইনে বিক্রি করতে সরকার লাখ লাখ টাকা খরচ করে ‘সদাই’ ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ বানায়। কিন্তু সেগুলো চালু হয়নি। এ ছাড়া গ্রামীণ কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং সরাসরি পাইকারের সাথে যুক্ত করতে উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় চালু হয় গ্রোয়ার্স মার্কেট। এ বাজারের অধিকাংশ এখন অকৃষিপণ্যের ‘মার্কেটে’ পরিণত হয়েছে। এগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার।
কৃষকরা আমাদের অর্থনীতির প্রাণ। তাদের উৎপাদনের ফলেই আমরা সুলভমূল্যে শাকসবজি খেতে পারি। কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য যাতে নিশ্চিত করা যায় সেদিকে সরকারকেই সবার আগে খেয়াল রাখতে হবে। নিতে হবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।