দেশের কৃষি খাতে ভয়াবহ সঙ্কটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গ্যাসসঙ্কটে ইতোমধ্যে সবক’টি সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দু’দিক থেকে এই চাপ বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর কৃষি অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক। সরকারি হিসাব বলছে, আপাতত মজুদ দিয়ে কয়েক মাস পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑ এটি সমস্যার সমাধান নয়।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা আছে। এই চাহিদার বড় অংশই আসে বিদেশ থেকে। স্থানীয় উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে পারে। কিন্তু এখন সেই উৎপাদনও বন্ধ। অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে অনিশ্চয়তায় পড়েছে সার সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী। বাংলাদেশে আমদানি করা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সারের সরবরাহ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে, ভবিষ্যতে আরো বাড়ার শঙ্কা আছে। এই বাড়তি দামের সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ে। আর পরোক্ষভাবে এই প্রভাব গিয়ে পড়বে খাদ্যদ্রব্যের দামে।
সরকারি আশ্বাসে বলা হচ্ছে, জুন-জুলাই পর্যন্ত চাহিদা মেটানো যাবে। কাতার-সৌদি আরব থেকে আমদানির প্রচেষ্টা চলছে বলেও জানানো হয়েছে। কিন্তু যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়? যদি হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি আরো জটিল হয়? তখন কি বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত আছে? অতীতে দেখা গেছে, সঙ্কটের আগেই আমাদের বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয়, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।
জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সার পরিবহন নিশ্চিত করতে টাস্কফোর্স গঠনের পদক্ষেপটি সরবরাহে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশের নিজস্ব প্রস্তুতি ও কৌশলই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এখন গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তত আংশিকভাবে হলেও সার কারখানাগুলো চালু করার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। শিল্প খাতের সাথে সমন্বয় করে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস বরাদ্দ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সেই সাথে সার আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অন্যান্য উৎসের কথাও ভাবতে হবে। পর্যায়ক্রমে একটি কার্যকর ও কৌশলগত সার মজুদ গড়ে তুলতে হবে। এই মজুদ দিয়ে যেন কেবল এক মৌসুম নয়, দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট মোকাবেলা করা যায়।
সারের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কম সার ব্যবহার করে ভালো ফসল উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষার ভিত্তিতে সার ব্যবহার করা যায়। বিকল্প হিসেবে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর কথাও ভাবতে হবে। সেই সাথে বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি জরুরি, যাতে কোনোভাবেই কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি না হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, কৃষিকে কেবল একটি খাত হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তায় বিঘ্ন হলে এর প্রভাব অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতির প্রতিটি স্তরে পড়বে।
সারসঙ্কটের এই ঝড় এখনো পুরোপুরি আঘাত হানেনি। কিন্তু এর পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই মুহূর্তে দূরদর্শী ও দ্রুত সিদ্ধান্তই পারে বিপর্যয় এড়াতে।