ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র, জুলাই অভ্যুত্থানের অগ্রসেনানী ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি সহিংস ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালে দেশী-বিদেশী অপশক্তি মরিয়া। এসব ঘটনা জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আশার কথা, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে সরকার ইতোমধ্যে নিরাপত্তা ইস্যু সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়িয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই সংঘটিত সহিংসতা প্রমাণ করে, রাষ্ট্র গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ভেতর দিয়ে প্রতীয়মান হয়, এই মুহূর্তে জাতীয় নিরাপত্তার দুর্বলতা স্পষ্ট। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে ঘটে যাওয়া হামলার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এগুলো ঠাণ্ডা মাথায় দেশবিরোধী শক্তি ঘটিয়েছে। নির্বাচন ঘিরে ভীতি, অস্থিতিশীলতা ও বিভাজন সৃষ্টি করাই এদের লক্ষ্য। এ পরিস্থিতি অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য প্রধানতম সতর্কতা। এ সঙ্কটের মূলে শুধু সহিংস শক্তি নয়, বরং অভ্যুত্থানের অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলোর দায় রয়েছে। দলগুলো নিজস্ব লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্ত এর জন্য কম দায়ী নয়। অথচ অভ্যুত্থান-পরবর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী সবার সামনে পুরনো শাসনকাঠামো আমূল বদলে নতুন রাষ্ট্র ও ফ্যাসিবাদবিরোধী সংস্কৃতি গড়ার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হাজির ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পক্ষগুলো সরকারকে সহযোগিতার বদলে সচেতনভাবে পদে পদে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। তাদের হাতে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে কোনো কৌশল না থাকায় বিরোধ এখনো শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই যে অনৈক্য ও বিরামহীন বিরোধিতা, এটি অনিশ্চিত ও সাংঘর্ষিক পরিবেশের জন্ম দিয়েছে, যা সহিংস ও নৈরাজ্যবাদী প্রবণতাকে উসকে দিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় জনমনস্তত্তে¡ গভীর অনৈক্যের বীজ রোপিত হয়েছে। দেখা দিয়েছে ফাটল। তাই নির্বাচনকালীন সহিংসতা এখন নিছক ‘দলীয় সংঘর্ষ’ নয়। সহিংস ঘটনার মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ ধ্বংসের মানে শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণের সাংবিধানিক অধিকারে সরাসরি আঘাত; যা দেখা গেছে ফ্যাসিবাদী জামানায়। তাই বর্তমান সহিংসতা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বিরুদ্ধে সংঘটিত হামলা হিসেবেই আমাদের দেখতে হবে।

আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ক্রমবর্ধমান জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে রাজনৈতিক দলগুলোর ন্যূনতম একটি নৈতিক চুক্তিতে আসতে হবে। একই সাথে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে পারে এমন সহিংসতা প্রত্যাখ্যান করা। পরস্পরের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বতার অধিকার স্বীকার করা এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে শত্রুতা নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে।

আমরা মনে করি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে নিরাপত্তা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সহিংসতায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেয়া যাবে না। অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। কারণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা সরাসরি ভোটাধিকারের ওপর আঘাত। বাস্তবতা হলো- অভ্যুত্থানকারী শক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাব দেশে ঘাপটি মেরে থাকা অপশক্তিকে সহিংসতা করতে উৎসাহিত করছে। সঙ্গতকারণে এ মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। এটি রাজনৈতিক সুবিধা নয়, এখনকার বাস্তবতায় জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়।