জুলাই ছিল নজিরবিহীন এক অভ্যুত্থান। ছাত্র-জনতার এ অভাবনীয় উত্থানের পেছনে ছিল গুম, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার হরণ এবং বিচারহীনতার দীর্ঘ বঞ্চনা। রাষ্ট্রের ভেতরে যে গভীর ক্ষত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট সরকার করেছিল, জুলাইয়ের লক্ষ্য ছিল তার মেরামত। সে জন্য অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ রচনা করেছে। গণভোটের মাধ্যমে তার সমর্থনও পাওয়া গেছে। বর্তমান সরকারের কাছে সবার প্রত্যাশা— জনরায়ের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়ে এর বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু দেখা গেল, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সংসদে উত্থাপন করেনি সরকার। এ অবস্থায় জুলাইয়ের হাজারো মানুষের আত্মত্যাগ মূল্যহীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে।

জাতি পুরনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দেয়ার আকাঙ্ক্ষী। বাস্তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ সেই পুরনোদের হাতে। সোজা কথায়— আগের কাঠামোর ওপর বসে থাকা আওয়ামী অপরাধী চক্র পালিয়ে গেছে। সেই পুরো ব্যবস্থা প্রায় অক্ষত রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনা সরকারের কাঠামো নিয়ে রাষ্ট্র চালাতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছে। তারপরও ড. ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার জুলাই সনদ প্রণয়ন করে। রাজনৈতিক দলগুলো একে বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও করে। গণভোটে এ সনদ দুই-তৃতীয়াংশ জনগণের সমর্থন পেয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জুলাই সনদ পাশ কাটাতে চাইছে— এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যে কারণে হাসিনা ফ্যাসিবাদ কায়েমের সুযোগ নিয়েছিলেন, সে কারণগুলো বিএনপিও চাইছে না বদলাতে। বিশেষ করে রাষ্ট্র একটি অত্যাচারী কাঠামোয় রূপ নিয়েছিল আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিচার বিভাগের যথেচ্ছ ব্যবহারে। বিএনপি সরকার জুলাই সনদে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ২০টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেনি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে— জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচার বিভাগ সংস্কারের অধ্যাদেশ।

শেখ হাসিনা ঠিক যে সুযোগগুলো রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে অন্যায়ভাবে নিয়েছে, এখন বিএনপিও কি একই ধরনের সুবিধা নিতে চায়? এর মাধ্যমে সরকারের জন্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে যথেচ্ছ ব্যবহারের পুরনো সুযোগ আবার চালু হওয়ার সুযোগ থাকবে। দুর্নীতিবাজদের সাজা দেয়ার বদলে নিজস্ব লোকদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবাধে লুটপাটের দরজা খোলা থাকবে। বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করে বিরোধী পক্ষকে দমনের হাতিয়ার বানানোর পুরনো ব্যবস্থা অটুট থাকবে। বাদ দেয়া অধ্যাদেশের মূল বিষয় এগুলো। তাই নাগরিক সমাজ ও বিরোধী দলগুলো এর কঠোর সমালোচনা করছে। জামায়াতের নেতৃত্বে বিরোধী দল সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে সংসদ থেকে ওয়াক আউট করেছে।

রাষ্ট্রের বাহিনীগুলো যদি নিয়ন্ত্রিত বিধিব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত না হয়, বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন না থাকে, আর দুর্নীতি দমনের জন্য নিয়োজিত কমিশন যদি দুর্নীতিতে আশকারা দেয়, তাহলে দেশের অবস্থা কেমন হয়— তার উদাহরণ বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন। বর্তমান জাতীয় সংসদ পুরনো পীড়নবাদী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সাক্ষী হয়ে আছে। এ সংসদে গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে আছেন গুম হয়ে যাওয়া রাজনীতিকের স্ত্রী। এ সংসদে নির্বাচিত প্রায় সব সদস্য হাসিনার বিচারব্যবস্থার ভয়াবহ শিকার। অন্য দিকে আছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়ার নগদ উদাহরণ। পুরনো ব্যবস্থা যদি বহাল রাখা হয়, তাহলে অচিরে শেখ হাসিনার শাসন দেশে ফিরে আসবে।