সাধারণত ডেঙ্গুর মৌসুম হিসেবে ধরা হয় মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গু এখন নির্দিষ্ট মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। এই রোগের সংক্রমণ বছরজুড়ে। বৃষ্টি ও উচ্চ আর্দ্রতায় বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেই সাথে দেখা যাচ্ছে হামের প্রকোপ। ডেঙ্গুতে এক দিনে চারজনের মৃত্যু এবং দেড় হাজারের বেশি নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি, হাম ও এর উপসর্গে প্রায় এক হাজার শিশুর মৃত্যুর খবর মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করেছে। আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির ব্যর্থতা প্রকাশ হচ্ছে।

২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রেখে আসছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এর মধ্যে এই রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয় ২০২৩ সালে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গেল বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজারের মতো।

গত রোববার স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রাম, খুলনা এবং সিলেট বিভাগে তিন শিশু মারা গেছে। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৪০১ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এরপরই আছে সিলেট বিভাগ, যেখানে প্রাণহানি ঘটেছে ১৫৫ জনের।

হামের উচ্চ সংক্রমণ থেকে বোঝা যায় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রান্তিক ও অনুন্নত এলাকায় ইপিআই কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি আছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে এ ধরনের শৈথিল্য কেন দেখা দিলো, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে।

অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। মশা নিধনে স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর অনিয়মিত ও লোকদেখানো অভিযান যে মশার বংশবৃদ্ধি রুখতে পারছে না, তা স্পষ্ট। একই সাথে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা ও সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় জনভোগান্তি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

জনস্বাস্থ্যের এই সঙ্কট-সময় মোকাবেলায় জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে নীতিনির্ধারকদের। কেবল পরিসংখ্যান প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। হামপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে হবে। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারি বাড়াতে হবে। রোগ নির্ণয় ও দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সাথে মশা নিধনে অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বন নিয়ে ভাবতে হবে। তৃণমূলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন, ওষুধ ও আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।

রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে পড়লে শুধু উন্নত চিকিৎসা দিয়ে প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব নয়। ডেঙ্গু ও হামের মতো নিয়ন্ত্রণযোগ্য ব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব কঠিন কিছু নয়। এই রোগ যদি মহামারীর মতো ছড়িয়ে যেতে থাকে, তখন বুঝতে হবে সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনায় সমস্যা রয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।