নদীভাঙন বাংলাদেশের এক নিয়তি। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ প্রতি বছর আঘাত হানছে নদীতীরের জনপদে। এর ভয়াবহতা যে কতটা বিধ্বংসী তা কেবল এর শিকার যারা তারা বলতে পারেন। আমাদের দেশে নদীভাঙনে প্রতি বছর গড়ে দেড় লাখ মানুষ গৃহহীন হন। ক্ষতিগ্রস্ত হন কমবেশি ১০ লাখ।

সঠিক পরিকল্পনার অভাবে দেশে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। এটি সমতলের বাস্তবতা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে উপকূলবাসীর সংগ্রাম নিত্যদিনের। সেই সংগ্রাম যখন দুর্বল অবকাঠামো আর প্রশাসনিক ধীরগতিতে জীবন-জীবিকায় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়; তখন ক্ষোভ ও আতঙ্ক দেখা দেয়া স্বাভাবিক। চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নে শঙ্খ নদের প্রবল স্রোতে বেড়িবাঁধের সাম্প্রতিক ধস ও ফাটল ওই শঙ্কা ফের সামনে এনেছে।

সাম্প্রতিক সময়ের টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং জোয়ারের প্রবল তোড়ে মাঝির ঘাট থেকে নাপিত খাল পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকার বাঁধ এখন চরম ঝুঁকিতে। ইতোমধ্যে মাঝির ঘাট এলাকায় বাঁধের বড় একটি অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের নদীভাঙনকবলিত এলাকার অধিবাসীরা।

উপকূলীয় এলাকার অর্থনীতি মূলত কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদনে প্রকাশ, বাঁধ ভেঙে গেলে জুঁইদণ্ডীর ২ থেকে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হবে। জোয়ারের পানি সামান্য বাড়লে ঘরবাড়ি, শত শত একর ফসলি জমি এবং অসংখ্য মাছের ঘের তলিয়ে বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হবে। এমনিতে গত দুই দশকে শঙ্খের ক্রমাগত ভাঙনে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বহু বসতভিটা ও জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। বারবার ঘরবাড়ি ও ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া এসব মানুষের কাছে নতুন করে বাঁধ ভাঙার প্রতিটি ফাটল এক একটি আতঙ্ক। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এবার বাঁধে ফাটল দেখা দেয়ায় এলাকাবাসী দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সূত্র মতে, জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান আছে। নৌবাহিনীর মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মাঝির ঘাটের ভাঙনকবলিত এলাকা জরিপ করে ডিপিপি প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। আপাতত জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সাময়িক প্রতিরোধ হিসেবে জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। নদীভাঙনের মতো জটিল ও প্রলয়ঙ্করী সমস্যার সমাধান বস্তা ফেলে সম্ভব নয়। দরকার টেকসই ও স্থায়ী নদীশাসন ব্যবস্থা।

প্রশ্ন হলো— আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা ডিপিপি তৈরির দীর্ঘসূত্রতায় ভাঙন প্রতিরোধে বিলম্ব হলে মানুষের ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার কে নেবে? শুষ্ক মৌসুমে কাজের গতি ধীর থাকা এবং বর্ষা এলে তড়িঘড়ি করে জিও ব্যাগ ফেলার যে পুরনো সংস্কৃতি, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

উপকূলীয় বেড়িবাঁধ শুধু মাটির স্তূপ নয়। হাজারো উপকূলবাসীর জীবন, জীবিকা ও স্বপ্নের রক্ষাকবচ। আনোয়ারার শঙ্খ নদের তীরবর্তী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নদীপাড়ের মানুষের নিরাপদ জীবনযাপন নিশ্চিত করা হোক কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।