নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছে দেয়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। কিন্তু তা বাস্তবায়নে প্রতি বছর নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। কাগজ সঙ্কট, দরপত্রের জটিলতা, মুদ্রণকাজে বিলম্ব, ছাপাখানাগুলোর মধ্যে কাজের অসম বণ্টন ও দুর্বল সমন্বয়ের মতো সমস্যার সাথে এবার যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎসঙ্কট। ফলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই এ ব্যাপারে এখন থেকে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
পাঠ্যবই মুদ্রণ সময়সাপেক্ষ ও বহু ধাপের কাজ। কাগজ কাটা থেকে শুরু করে মুদ্রণ, ভাঁজ করা, বাঁধাই, প্যাকেজিং ও পরিবহন, প্রতিটি ধাপে বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু মুদ্রণযন্ত্র বন্ধ থাকে না; শ্রমঘণ্টাও নষ্ট হয়। অনিবার্যভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরিণতিতে সরবরাহসূচি পিছিয়ে যায়। বিশেষ করে বছরের শেষ কয়েক মাসে যখন বিপুলসংখ্যক বই একসাথে মুদ্রণ ও সরবরাহ করতে হয়; তখন বিদ্যুৎ বিভ্রাট বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা তাই বলে।
২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই সরবরাহ নানা কারণে বিলম্ব হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী বছরের শুরুতে প্রয়োজনীয় বই হাতে পায়নি। পুরনো বই, ফটোকপি কিংবা ডিজিটাল সংস্করণে নির্ভর করতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়; সেজন্য ২০২৭ সালের বই মুদ্রণে বিদ্যুৎসঙ্কটকে নিছক সম্ভাব্য সমস্যা হিসেবে না দেখা উচিত হবে না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হলো- পাঠ্যবই সরবরাহের কার্যাদেশ পাওয়া সব প্রেসে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। যেসব এলাকায় বিপুলসংখ্যক ছাপাখানা অবস্থিত, সেসব এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা। বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে এসব প্রেসকে লোডশেডিংয়ের বাইরে রাখা অথবা অত্যাবশ্যক সময়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে নিয়ে সমন্বিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
শুধু সরকারি নির্দেশনা দিলে কাজ শেষ হবে না। কোন প্রেসে কতটি বই ছাপার দায়িত্ব রয়েছে, তাদের দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা কত, বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে বিকল্প ব্যবস্থা কী এবং পর্যাপ্ত জেনারেটর রয়েছে কি না- এসব তথ্য এনসিটিবিএর কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়মিত হালনাগাদ রাখা দরকার। কোনো প্রেস নির্ধারিত উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় পিছিয়ে পড়লে দ্রুত তার কাজ অন্য সক্ষম প্রেসে ভাগ করে দিতে হবে। এতে শেষ মুহূর্তে অল্পসংখ্যক প্রেসের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার ঝুঁকি কমবে।
সরকার পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহকে জরুরি খাত হিসেবে বিবেচনা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিয়েছে, এটি আশাব্যঞ্জক। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির এই উদ্যোগ কার্যকর করতে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিতরণকারী সংস্থা, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট প্রেস মালিকদের মধ্যে সার্বক্ষণিক সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু চিঠি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা-ও নিয়মিত তদারক করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, পাঠ্যবই কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়। এটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের অপরিহার্য উপকরণ। একটি বই সময়মতো না পৌঁছানোর অর্থাৎ-একটি শিশুর শেখার সুযোগ ব্যাহত হওয়া। তাই ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই মুদ্রণে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।