কৃষির অপরিহার্য উপকরণ সার। সারের সঙ্কট দেখা দিলে শুধু কৃষকের দুর্ভোগ নয়; এর অভিঘাত পড়ে সামগ্রিক অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থায়। দেশের নানা প্রান্তে সারের কৃত্রিম সঙ্কট, অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং ডিলার-খুচরা ব্যবসায়ীদের কারসাজির উদ্বেগজনক খবর আসছে।

কৃষক বীজ, সেচ, শ্রম, জ্বালানি ও কীটনাশকের বাড়তি ব্যয়ের চাপে আছেন। তার ওপর সারের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় শুধু তাদের ঘাড়ে বোঝার ওপর শাকের আঁটি আপতিত করা নয়, এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তায়ও হুমকি বয়ে আনবে।

সারা দেশের কৃষক আমন জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণে ব্যস্ত। গণমাধ্যমের খবর, এই সময়ে অতিরিক্ত টাকা না দিলে মিলছে না প্রয়োজনীয় সার; যার প্রভাব অবধারিতভাবে পড়বে আমন উৎপাদনে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে কৃষক অনেক স্থানে আন্দোলন করছেন। গত ১০ আগস্ট সার না পাওয়ায় লালমনিরহাটে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কয়েক হাজার কৃষক।

সরকার বলছে, দেশে বর্তমানে সারের কোনো ঘাটতি নেই। একটি মহল সারের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির অপচেষ্টা করছে। তবে সরকারি গুদাম বা ডিলার পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুদের কথা বলা হলেও বাস্তবে কৃষক নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না। ‘সার নেই’ বলে ডিলার কৃষকদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অথচ খুচরা বাজারে বেশি দামে মিলছে সার।

সময়মতো সার না পেলে কৃষককে এক দিকে অতিরিক্ত দামে তা কিনতে হয়, অন্য দিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার না পেলে প্রয়োগ করতে না পারলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হয়। কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফল হিসেবে ভালো ফলনের সম্ভাবনাও কমে। সারের বাজারে নৈরাজ্য চলতে থাকলে কৃষকের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার সারে ভর্তুকি দিচ্ছে। কৃষকের স্বার্থে মূল্য নির্ধারণ করছে। সেই সুবিধা মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এর অর্থ- সরবরাহব্যবস্থায় গুরুতর দুর্বলতা আছে। শুধু পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে হবে না; সঠিক সময়ে, নির্ধারিত দামে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

সার সঙ্কট দূর করতে হলে ডিলার-ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। কোন ডিলার অবৈধ পন্থায় সার মজুদ করছেন, চিহ্নিত করতে হবে। কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অভিযান চালিয়ে জরিমানা যথেষ্ট নয়। সঙ্কট সৃষ্টির সাথে জড়িত পুরো চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সেই সাথে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সারের মজুদ, উত্তোলন, বিক্রি ও পরিবহনের তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা আবশ্যক। এতে গুজব ও কারসাজির সুযোগ কমবে। এ জন্য কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয় করা অপরিহার্য। কৃষকের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে বাজার পরিদর্শন, গুদাম যাচাই এবং নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সঙ্কট তৈরির আগেই নজরদারি জোরদার করা বেশি কার্যকর।

সার সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দ্রুত চিহ্নিত করে ডিলার-খুচরা বাজারে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্যে উপযুক্ত সময় প্রয়োজনীয় সার পান যেকোনো মূল্যে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।