আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর নতুন বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন হতে যাচ্ছে। একই সাথে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। গণভোটে জনগণ রায় দেবে, আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে। এমন এক সন্ধিক্ষণে কোনোভাবেই দেশ অস্থিতিশীল হোক, সেটি কাম্য নয়।

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করে ইনকিলাব মঞ্চ। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুক্রবার বিকেল ও সন্ধ্যায় শাহবাগ এলাকায় পুলিশের সাথে দুই দফায় সংঘর্ষ হয় তাদের। পরে কর্মসূচি স্থগিত করে ইনকিলাব মঞ্চ।

শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলন স্বাভাবিকভাবেই জনসমর্থন পাওয়ার কথা। প্রকাশ্যে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর বিচার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক হবে, এটাই ছিল মানুষের প্রত্যাশা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এতদিনেও সেই বিচারে দৃশ্যমান অগ্রগতি আসেনি। এতে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে। এখানে সরকারের আরো স্বচ্ছ ও সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত ছিল– এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই।

তবে একই সাথে এটাও সত্য, নির্বাচন একেবারে সামনে রেখে যমুনা ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি দেয়া সময়োপযোগী ছিল না। এমন কর্মসূচি অনাকাক্সিক্ষত সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ায়, উসকানিদাতা ও ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য বিচার নয়; বরং নির্বাচন বানচাল ও রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা। ইনকিলাব মঞ্চ থেকেই বলা হয়েছে, তাদের আন্দোলনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সতর্কবার্তা পরিস্থিতির গভীরতাই তুলে ধরে।

এ অবস্থায় সরকার যে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের দফতরের সহায়তা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি ইতিবাচক। এই উদ্যোগ আরো আগে নিলে পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিরপেক্ষ তদন্তের পথে অগ্রসর হওয়া আস্থার সঙ্কট কিছুটা হলেও কমাবে। একই সাথে এতে আন্দোলনের নৈতিক দাবিটিও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এগোনোর সুযোগ পাবে।

পে স্কেল আন্দোলনের প্রসঙ্গটিও এই সময়ে এসেছে, যা মূলত প্রশাসনিক দাবি হলেও নিরাপত্তা সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, এখানেও পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত মিলেছে। সাধারণ কর্মচারীদের ন্যায্য দাবিকে ঢাল বানিয়ে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই মুহূর্তে সব পক্ষকেই সতর্ক থাকতে হবে।

এই সময়ে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন, আগে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া। ইনকিলাব মঞ্চও এই বাস্তবতার সাথে একমত, এটি তাদের বক্তব্য ও অবস্থান থেকেই স্পষ্ট। রাষ্ট্রের এই সঙ্কটে সংযমের ডাক দেয়া এবং নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেয়ায় তারা ধন্যবাদ প্রাপ্য।

বিচার চাই, এই দাবি ন্যায্য। বিশেষ করে শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার এত দিনে দৃশ্যমান হয়নি কেন, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার পথ যেন অস্থিরতা, সংঘর্ষ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে না যায়।

নির্বাচনের আগে ষড়যন্ত্রকারীদের নানা অপচেষ্টা সম্পর্কে আমাদের সজাগ থাকা জরুরি। কারণ তারা সুযোগ পেলে গোটা বিচার প্রক্রিয়াই পণ্ড হতে পারে। তাই এখন প্রয়োজন ধৈর্য, সচেতনতা ও ঐক্য। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এই বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান ও কার্যকরভাবে এগিয়ে যাবে, এই আশাবাদ আমাদের রাখতেই হবে।