নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ও পেনশনের হার বাড়ানো হয়েছে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। গত ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হয়েছে। এতে গ্রেডভেদে মূল বেতন বাড়বে তিন ধাপে এবং পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে দুই বছরে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ কর্মচারী উপকৃত হবেন। পাশাপাশি ৯ লাখেরও বেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য সুবিধাভোগী এর আওতায় আসবেন। সব মিলিয়ে সুবিধাভোগী হবেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ, যারা মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশের কম। বাকি ৯৮ শতাংশ থেকে যাচ্ছেন বাইরে।
সরকারিভাবে বলা হয়েছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান বিবেচনায় নিয়ে এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতনকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই এই বেতনকাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। উপকারভোগী ৩৩ লাখ মানুষের জন্য এটি নিঃসন্দেহে সুখবর।
নতুন সরকারের এই উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপ আলোচনার জন্ম দিয়েছে নানা পর্যায়ে। বিগত সরকারের দুঃশাসনে সৃষ্ট বিপুল মূল্যস্ফীতির ভারে জর্জরিত দেশবাসী। দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় চাপ আরো বেড়েছে। অর্থবছরের শেষ মাস জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। তার আগে জুনে ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এই অবস্থায় নতুন জাতীয় পে-স্কেলের প্রভাব নির্ঘাত বাজারে পড়বে। নিত্যপণ্যের দামসহ জীবনযাত্রার প্রায় সব ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে। বাড়তে পারে বৈষম্য, দারিদ্র্য ও তারল্য সঙ্কটের মতো আর্থসামাজিক ঝুঁকি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পূর্বপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি দরকার। সরকারের সে প্রস্তুতি আছে বলেই আমাদের বিশ্বাস। পে-স্কেলের বাড়তি ব্যয় নির্বাহে সরকারকে আয় বাড়াতে হবে। সরকারের আয়ের খাতগুলো দুর্নীতিমুক্ত করতে পারলে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং অতিরিক্ত ব্যয় মেটানো কঠিন নয়। একই সাথে বাজার নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারেন। সেই সাথে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্পকারখানার উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসায়-বিনিয়োগ ও উৎপাদনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। যেন তারা কর্মচারীদের যৌক্তিক পর্যায়ে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন।
বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ পড়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থা থেকে তাদের উদ্ধার করা জরুরি। বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের বেতন বা আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করাও সরকারের দায়িত্ব। পে-স্কেলের আওতাধীন ৩৩ লাখের বাইরের কোটি কোটি মানুষের জীবনে স্বস্তি আনার ব্যাপারেও সরকারের দায় আছে; তা ভুলে গেলে চলবে না।
বর্তমানে দেশে জ্বালানি সঙ্কট ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষ রান্নার চুলায় গ্যাস পাচ্ছে না, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ। তার চেয়েও বড় খারাপ খবর হলো— জ্বালানির অভাবে বন্ধ হচ্ছে শিল্প-কারখানা। অসংখ্য কল-কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনা দুরূহ। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলে সেটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সেই চ্যালেঞ্জ কি সরকার নিতে পারবে?