মক্কা চুক্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা
দেশের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর সহযোগিতামূলক কোনো সাধারণ জোট গঠন করা হয়নি, বরং এটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার সংবলিত একটি সামরিক ব্যবস্থা। ফলে ধর্মীয় আবেগ, কোনো দেশের প্রতি বিশেষ অনুরাগ কিংবা কোনো রাষ্ট্রের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নেয়া উচিত হবে না। বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থই হওয়া প্রয়োজন সিদ্ধান্তের একমাত্র ভিত্তি।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হলে বাংলাদেশ দূরবর্তী অথবা বৃহত্তর আঞ্চলিক ও সামরিক সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। বাংলাদেশের সক্ষমতা বিচারে এ ধরনের সঙ্ঘাতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলার যৌক্তিকতা আদৌ আছে কি না তা বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। তাই সব দিক বিবেচনায় নিয়েই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির ব্যাপারে বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি (মক্কা চুক্তি নামেও পরিচিত) সই হয়েছে, যা একটি ত্রিপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসাবে অভিহিত হওয়া এই চুক্তিটি একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে একজন স্বাক্ষরকারীর ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসাবে গণ্য করা হবে। চুক্তির মূল স্তম্ভগুলো এই ব্যবস্থাটির তিনটি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের অনন্য কৌশলগত শক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছে। প্রতিরক্ষা প্রকল্পের জন্য সৌদি আরবের প্রয়োজনীয় তহবিল সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। তুরস্কের রয়েছে উন্নত প্রযুক্তির প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম। আর পাকিস্তান সম্মুখসারির যোদ্ধা এবং প্রচলিত সামরিক শক্তি সরবরাহ করতে পারে। এ ছাড়া মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানই একমাত্র পারমাণবিক বোমার অধিকারী।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃকার্যক্ষমতা (ইন্টারঅপারেবিলিটি) উন্নত করার জন্য সম্মিলিত সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, কৌশলগত নিরাপত্তা তথ্য বিনিময় এবং রিয়েল-টাইম হুমকি মূল্যায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক চ্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। জোটটি সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় সদস্য দেশগুলো ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এনে অন্য আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে তাদের নিরাপত্তা পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
এ ব্যাপারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। প্রথমত, এই জোটে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করতে পারে। বাংলাদেশের ওপর কোনো বহিঃশক্তি সামরিক চাপ সৃষ্টি করলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সমর্থন পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের নিজস্ব সামরিক শক্তি সীমিত হওয়ায় একটি কার্যকর সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের হিসাব জটিল করতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর আধুনিকায়নে এ জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তুরস্ক থেকে ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র, সাঁজোয়া যান, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। পাকিস্তানের সাথে প্রশিক্ষণ, সামরিক শিক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সন্ত্রাস দমন, বিমান প্রতিরক্ষা ও যৌথ মহড়া সম্প্রসারিত হতে পারে। সৌদি অর্থায়নে প্রতিরক্ষা প্রকল্প, সামরিক অবকাঠামো এবং যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও আছে। তৃতীয়ত, মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তাসংক্রান্ত আলোচনায় বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী হতে পারে। বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিমপ্রধান দেশ। এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। ফলে জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশ মধ্যপন্থা, শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণের পক্ষে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
অপর দিকে এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমত, বাংলাদেশকে নিজের সাথে সম্পর্কহীন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে। সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল, ইয়েমেন, ইরান ও জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে। তুরস্কের নিরাপত্তা স্বার্থ- সিরিয়া, ইরাক, পূর্ব-ভূমধ্যসাগর, ককেসাস ও কুর্দি প্রশ্নের সাথে জড়িত। পাকিস্তানের প্রধান উদ্বেগ ভারত, আফগান সীমান্ত এবং অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ। এসব সমস্যা বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন। চুক্তি সইকারী কোনো দেশ আক্রান্ত হলে বাংলাদেশকে সেনা, নৌযান, বিমান অথবা অস্ত্র পাঠাতে হতে পারে। এতে বাংলাদেশীদের জীবন, সম্পদ ও সামরিক সক্ষমতা এমন সঙ্ঘাতে ব্যয় হতে পারে, যেখানে আমাদের প্রত্যক্ষ স্বার্থ নেই। বিশেষ করে ইরান, ইয়েমেন অথবা অন্য কোনো আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের পক্ষ হয়ে গেলে বাংলাদেশ নিজের দীর্ঘ দিনের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক হারাতে পারে। দ্বিতীয়ত, জোটে যোগদান বাংলাদেশের জোটনিরপেক্ষ ও ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি সঙ্কুচিত করতে পারে। বাংলাদেশ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, ভারত, রাশিয়া, ইরান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ওমানের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে। আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে প্রবেশ করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশ আসলে কোন বলয়ের সদস্য? বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের প্রধান বাজার ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং চীন বড় বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদার। সামরিক মেরুকরণে কোনো পক্ষের নিষেধাজ্ঞা, রফতানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ হ্রাস বা বাণিজ্যিক বাধা সৃষ্টি হলে তার মূল্য সাধারণ মানুষকে দিতে হবে। বাংলাদেশের মতো রফতানি ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য কৌশলগত নমনীয়তাই মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। তৃতীয়ত, ভারতের সাথে সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে। পাকিস্তান থাকায় এ জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে দিল্লি সন্দেহের চোখে দেখতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতায়। তবে ভারতের সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের নির্ধারক হতে পারে না। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। একই সাথে প্রতিবেশী ভারতের সাথে প্রায় সম্পূর্ণ স্থলসীমান্ত, নদী, যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা উপেক্ষা করাও কৌশলগত প্রজ্ঞার পরিচায়ক হবে না।
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সইকারী দেশগুলোর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি রয়েছে। ইরান ও ইয়েমেনের হাউছিদের কাছে থেকে নিরাপত্তা হুমকীতে রয়েছে সৌদি আরব। পাকিস্তান ও ভারতের উত্তেজনা সবসময়ই বিরাজমান। ইসরাইলকে নিয়ে টেনশনে আছে তুরস্ক। এখন মক্কা চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশ তাদের নিরাপত্তা হুমকিগুলো মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী স্বাক্ষরকারী কোনো দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসাবে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ এক দেশ অপর দেশকে সামরিক দিক থেকে সহায়তা করবে। এখন বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে। বাংলাদেশ কি ভারতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবে? এটা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে? এই ধরনের সামরিক জোটে যুক্ত হলে বৃহত্তর আঞ্চলিক ও সামরিক সঙ্ঘাতে বাংলাদেশ জড়িয়ে পড়তে পারে। এখন বাংলাদেশের সক্ষমতা বিচারে এ ধরনের সঙ্ঘাতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলার যৌক্তিকতা আদৌ আছে কি না- তা বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য তড়িঘড়ি করে প্রতিশ্রুতিতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বরং পর্যবেক্ষক হিসেবে সম্পৃক্ততা, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কাঠামোটিকে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। এতে একদিকে চুক্তিটি থেকে সম্ভাব্য সুবিধা নেয়া সম্ভব হবে, অন্য দিকে বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতাও বজায় থাকবে।