গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থায়ন : বার্কলেসের বিরুদ্ধে ব্রিটেনে মামলা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বাংলাদেশের সুন্দরবনের কাছে নির্মিত কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের (মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট) পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক বার্কলেসের বিরুদ্ধে ব্রিটেনে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ও মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের অত্যন্ত কাছে অবস্থিত। তাদের দাবি, এই কার্বন ও ভারী ধাতু নিঃসরণকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাথে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ ও বন্ড দিয়ে বার্কলেস ব্যাংক আন্তর্জাতিক পরিবেশগত নির্দেশিকা ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পরিবেশকর্মী এবং ভুক্তভোগী অঞ্চলের প্রতিনিধিরা এই মামলা দায়ের করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ঢাকার পরিবেশ আন্দোলনকর্মী শরিফ জামিল। এ ছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরামের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় কৃষকরাও এতে অংশ নিয়েছেন। ব্রিটিশ সরকারের ব্যবসা ও বাণিজ্য বিভাগের অধীনে ‘অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্ট’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে এই মামলা বা আইনি অভিযোগটি জমা দেয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের আইনি সহায়তা দিচ্ছে লন্ডনের কিংস কলেজের ল স্কুলের ‘কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিক’।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে পশুর নদীসহ সুন্দরবনের সংযুক্ত খাল ও নদীগুলোতে পারদ এবং আর্সেনিকের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতুর দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও স্থানীয় মানুষের জীবিকাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। পরিবেশকর্মীদের দাবি, ব্যাংকগুলোর উচিত আমদানিকৃত কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থায়ন না করে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো।

বার্কলেসের বিরুদ্ধে আর্থিক সংযোগের অভিযোগ

কিংস লিগ্যাল ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক বার্কলেস ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এনটিপিসি লিমিটেডের ঋণের আন্ডাররাইটার হিসেবে কাজ করেছে। এনটিপিসি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগের অংশীদার। অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বার্কলেস এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বন্ড ইস্যুতে আন্ডাররাইটার হিসেবে যুক্ত ছিল। এই ব্যাংক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ঋণ দিয়েছিল বলে দাবি অভিযোগকারীদের।

তাদের ভাষ্য, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সেবা দেয়ার আগে পরিবেশ ও মানবাধিকার ঝুঁকি যথেষ্টভাবে যাচাই করেনি বার্কলেস।

বাংলাদেশের পরিবেশকর্মী শরীফ জামিল এই মামলার অন্যতম অভিযোগকারী। তিনি বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং এর আশপাশের শিল্পকার্যক্রম থেকে ভারী ধাতুর দূষণ নদী ও খালের মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবেশ করছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পশুর নদীর তীরে অবস্থিত। শরীফ জামিলের ভাষায়, পশুর নদী সুন্দরবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দূষণের কারণে বনের স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে। গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সুন্দরবনের পানিতে পারদ ও আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া যায় পশুর নদীর পানিতে। শিল্পকারখানার বর্জ্য ও বন্দরের কার্যক্রম ভারী ধাতু দূষণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন গবেষকরা। গবেষণায় কয়লা পোড়ানোর নির্গমন এবং নৌযান চলাচল বৃদ্ধির কারণে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সুন্দরবনের জন্য ‘উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত হুমকি’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

সুন্দরবন ও জলবায়ু ঝুঁকি

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। বাংলাদেশ ও ভারতের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে থাকা এই বন বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল। এর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও রয়েছে। এই অঞ্চলে বসবাসকারী লাখো মানুষ খাদ্য ও জীবিকার জন্য নদী ও বনের ওপর নির্ভরশীল। অভিযোগকারীরা বলছেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা পোড়ানো থেকে কার্বন নিঃসরণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনিতেই সুন্দরবন ও এর আশপাশের এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় মানুষকে সুরক্ষা দিতে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময় থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ ছিল। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রামপাল প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বায়ু ও পানিদূষণের কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকাটি অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উচ্চ আশঙ্কা রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পটির সম্ভাব্য পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ফ্রান্সের কয়েকটি ব্যাংকসহ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এতে অর্থায়ন থেকে বিরত ছিল। শরীফ জামিল বলেন, বিশ্বব্যাপী পরিচিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করার দায়িত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যখন রামপাল প্রকল্প থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করছিল বা অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল, তখন বার্কলেসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিও পুনর্বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আরো বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, বাংলাদেশে সারা বছর সূর্যালোক পাওয়া যায়। তাই আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো উচিত।

অন্য অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃষক ও রাজনীতিক অনিমেষ মণ্ডল এবং মাছশ্রমিকদের সংগঠন দক্ষিণবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরাম। তাদের সহায়তা করছেন কিংস কলেজ লন্ডনের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও আইনজীবীরা। কিংস হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিনিকের আইনজীবী সু উইলম্যান বলেন, সুন্দরবনের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু ও প্রকৃতির সঙ্কটের সম্মুখসারিতে রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই অভিযোগের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তেল ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে অর্থায়নের আগে নতুন করে চিন্তা করবে। যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস ফর রেসপনসিবল বিজনেস কন্ডাক্ট এখন অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্ত করবে কি না, তা মূল্যায়ন করবে। বার্কলেস ব্যাংক এবং রামপাল প্রকল্পের হোল্ডিং কোম্পানি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনের কাছে অবস্থিত। সুন্দরবন একটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, যা একটি নদী ব-দ্বীপ জুড়ে ১০০টিরও বেশি ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে গঠিত এবং বেঙ্গল টাইগারসহ শত শত উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতিকে আশ্রয় দেয়।

জামিল বলেন, বার্কলেসের আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্থায়নের পরিণতি বিবেচনা করতে তাদের বাধ্য করে। তিনি বলেন, ‘আপনার খ্যাতি যত বেশি, এই গ্রহ এবং এর মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করার দায়িত্বও তত বেশি। বার্কলেস একটি স্বনামধন্য বৈশ্বিক সংস্থা, এবং সেই কারণেই এরও একটি দায়িত্ব রয়েছে।’