দেশে ঢুকছে মরণনেশা ক্রিস্টাল মেথ আইস ও ইয়াবা

সরকারি ভর্তুকির পণ্য দেদারছে যাচ্ছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর ডেরায়

Printed Edition

এস এম মিন্টু

সীমান্তের কাঁটাতার আর নাফ নদীর জলসীমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশের বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ভর্তুকির নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষকদের ইউরিয়া সার ও সিমেন্টসহ দেদার পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর ডেরায়। মাছ ধরার ট্রলারের আড়ালে এবং দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত পথ ব্যবহার করে সরকারের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), ওপেন মার্কেট সেলস (ওএমএস) এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেল চলে যাচ্ছে মিয়ানমারের প্রধান সশস্ত্র গোষ্ঠী- ‘আরাকান আর্মি’র (এএ) ডেরায়।

ভৌগোলিক সঙ্কটের কারণে তীব্র খাদ্য ও জ্বালানি সঙ্কটে পড়া এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রধান ‘লাইফলাইন’ বা জীবন রক্ষাকারী রসদ হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের এই ভর্তুকিপ্রাপ্ত সরকারি খাদ্যসামগ্রী।

গোয়েন্দা অর্থ স্থানীয়দের তথ্য এবং সম্প্রতি অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরে তীব্র মূল্যস্ফীতির সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার যে চাল-ডাল কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে দিচ্ছে, তা এ দেশীয় একটি প্রভাবশালী চক্র কালোবাজারে কিনে সীমান্ত পার করছে। বিনিময়ে ওপার থেকে আসছে মরণনেশা ইয়াবা এবং ক্রিস্টাল মেথ আইসের মতো শত শত কোটি টাকার মাদকের চালান।

পাচার চক্রের নেপথ্যে কারা ত্রিমুখী সিন্ডিকেটের অশুভ আঁতাত : অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই মহাপাচারের পেছনে রয়েছে মূলত একটি ত্রিমুখী শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি তিন স্তরে বিভক্ত। তার মধ্যে সুবিধাভোগী ও অসাধু জনপ্রতিনিধিদের নামও রয়েছে। টিসিবি ও ওএমএস কার্ডের তালিকা প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় কিছু ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং ডিলার এই চক্রের প্রথম স্তর। তারা ভুয়া নাম ও কার্ড ব্যবহার করে অথবা দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে ভর্তুকির চাল, চিনি ও তেল তুলে নেয়। সরকারি খাদ্যগুদামের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ট্রাকে ট্রাকে এই চাল চলে যায় সীমান্তসংলগ্ন ডাম্পিং স্টেশনগুলোতে।

সীমান্ত চোরাকারবারি ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট : কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, মহেশখালী ও ভোলার মনপুরা উপকূলীয় এলাকার একটি প্রভাবশালী চোরাচালান চক্র সরাসরি এই পণ্য সীমান্ত পার করার জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করে। কক্সবাজার ও টেকনাফের কতিপয় লাইসেন্সবিহীন তেল ব্যবসায়ী ও গুদাম মালিক এই চক্রের সাথে জড়িত। সীমান্ত দিয়ে সয়াবিন তেল, অকটেন ও পেট্রোল ড্রামজাত করে গভীর সাগর বা নাফ নদীর রুট ব্যবহার করে পাঠানো হয়।

মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর লিয়াঁজো ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝিরা : রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে সক্রিয় আরসা ও আরএসওর কিছু অস্ত্রধারী ক্যাডার এবং ক্যাম্পের কিছু অসৎ ‘মাঝি’ (ক্যাম্প নেতা) এই চক্রের তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কাজ করে। ওপারে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা আরাকান আর্মি (এএ) কিংবা সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথে এই নেটওয়ার্কের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। টাকা ও মাদকের লেনদেন সচল রাখতে ওপারে থাকা এজেন্টদের মাধ্যমে তারা পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

মাছ ধরার নৌকার এক মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় আমরা ভাড়া হিসেবে যাই। যারা মাদকের সাথে জড়িত তারাই এই সিন্ডিকেট, তারাই চোরাই বা পাচার চক্র। মিয়ানমার থেকে এর বিনিময়ে আসে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও মাদক।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফে প্রায় প্রতিদিনই মালবাহী ট্রাক আনলোড করা হয়। সেখানে লালু মাঝির আড়তের সামনে মালবাহী ট্রাকগুলো আনলোড করতে দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবে এই বাজারে টেকনাফ উপজেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল আসত ৩ থেকে ৪ গাড়ি। খাদ্যপণ্যগুলো পৌরসভার লামার বাজারে কয়েকটি অসাধু ব্যবসায়ীর দোকানের আড়তে মজুদ রাখা হতো। তার মধ্যে গফুর সওদাগর প্রধান বলে জানা গেছে। সন্ধ্যার পরপরই জিপ গাড়ি দিয়ে উপকূলের বিভিন্ন নৌকার ঘাটে পৌঁছিয়ে দেয়া হয় পাচারকারীদের নিরাপদ স্থানে। সেখান থেকে ভাড়া করা ফিশিং বোটে নিয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে নাকং দীপ নামক খালে। সেখান থেকেই মিয়ানমারের বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দিনমজুর বলেন, আমরা স্বাভাবিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল আনলোড করতাম ২ থেকে ৩ ট্রাক। মিয়ানমারে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেখানে চরম খাদ্য সঙ্কটের কারণে প্রচুর পরিমাণ খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা আড়তে মজুদ রাখছে। সেখান থেকেই সুবিধা মতো পাচার করছে। বেশির ভাগ মালই সরকারি পণ্য।

চিহ্নিত সিন্ডিকেট ও সুনির্দিষ্ট স্পট : মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, এই মহাপাচারের মূল হোতা হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার বেশ কয়েকজন চিহ্নিত কালোবাজারি ডিলার ও স্থানীয় ইউপি সদস্যের নাম উঠে এসেছে। বিশেষ করে টেকনাফ সদর, সাবরাং এবং উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের সীমান্তসংলগ্ন এলাকাগুলো ব্যবহার করে এই চক্রটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয়।

গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্র জানায়, টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়া ঘাট, সদরের বড়ইতলীর ঘাট, মেরিন ড্রাইভ লম্বরীর ঘাট, তুলাতুলীর ঘাট, মহেশখালীয়া পাড়ার ঘাট, হাবির ছড়া ঘাট, রাজার ছাড়া ঘাট, সাবরাং ইউনিয়নের বাহার ছড়া ঘাট, খুরেরমুখের ঘাট, কুরাবুইজ্জ্যা পাড়ার ঘাট, শাহপরীর দ্বীপ মাঝেরপাড়ার ঘাট, হোয়াইকং উনছিপ্রাং, সাবরাং নয়াপাড়া কচুবুনিয়া ঘাট, নয়াপাড়া জিরো পয়েন্ট ও সেন্টমার্টিনের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এসব ঘাট থেকে পাচার হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী। পাচারের সাথে জড়িত রয়েছে স্থানীয় মাদক সিন্ডিকেট। পাচারের সুবিধার্থে প্রস্তুতকৃত পণ্যগুলো পাচারের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পাহারা দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে কয়েকজন পাহারাদার। প্রশাসনের প্রবেশ বা মানুষের চলাচলের পথে আনাগোনা আছে কি না নিশ্চিত করে থাকে। সুযোগ বুঝে মজুদ রাখা মালামালগুলো নৌকার ঘাট থেকে মাছ ধরতে যাওয়া ফিশিং বোটে তুলে দেয়।

সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম, তাজিয়াকাটা ও ঘটিভাঙ্গা এলাকায় প্রশাসনের এক বিশেষ অভিযানে পাঁচটি ভাসমান ও একটি স্থায়ী তেল বিক্রয়কেন্দ্র সিলগালা করা হয়, যা মূলত লাইসেন্সবিহীন ব্যবসার আড়ালে মিয়ানমারে সরকারি ও বাণিজ্যিক জ্বালানি তেল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাচারের মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।