‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর প্রচারণা চালিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার। শুনতে বিষয়টা আধুনিক ও জনকল্যাণমুখী মনে হলেও, সেগুলোর পেছনে ছিল রাজনৈতিক প্রচারণা, তথাকথিত উন্নয়নের ঢাকঢোল পেটানো এবং কিছু প্রকল্পকেন্দ্রিক কেনাকাটার আয়োজন। বাস্তবে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নাগরিক সেবার গুণগত রূপান্তর করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে নাগরিক ভোগান্তি আরো বাড়িয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল ব্যবস্থার পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। বাস্তবে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ডিজিটাল সেবার নামে ‘অনলাইন ও ম্যানুয়াল’ ব্যবস্থার প্রহসন চলছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে আবেদন করার পরও কাগজপত্র জমা, স্বাক্ষর বা ফি পরিশোধের জন্য নাগরিকদের বারবার সরকারি দফতরেই দৌড়াতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ অপচয় হচ্ছে। এই দ্বিমুখী পদ্ধতির ফলে নাগরিকদের সময় ও অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি সেবা খাতে দুর্নীতি ও হয়রানির সুযোগ থেকেই যাচ্ছে। সিপিডি যাদের ওপর গবেষণা চালিয়েছে, তাদের থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি অনলাইনে সেবা পেয়েছেন মাত্র ৩১.৯ শতাংশ নারী এবং ৪৩.৮ শতাংশ তরুণ। বাকি বেশির ভাগ নাগরিককেই কোনো না কোনো ধাপে অফলাইন প্রক্রিয়ায় ফিরতে হয়েছে।

শুধু তাই নয়, স্থানীয় সরকার দফতরের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর অবস্থা খুব করুণ। ১০০-এর মধ্যে সরকারি দফতরগুলোর সার্বিক প্রস্তুতির গড় স্কোর মাত্র ৩৮.৯, আর অবকাঠামোগত প্রস্তুতি একেবারে তলানিতে— মাত্র ২৪.১। ইউনিয়ন কৃষি দফতরে গড়ে মাত্র ০.১৫টি সচল কম্পিউটার থাকে। ৯৭ শতাংশ কার্যালয়ে বিদ্যুৎ ব্যাকআপ থাকে না। এ অবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন ডিজিটাল সেবার দাবি কেবল পরিহাস। এছাড়া প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে আঞ্চলিক বৈষম্যও। ময়মনসিংহের প্রস্তুতি স্কোর ৫৭.৩ হলেও রংপুরের স্কোর মাত্র ৮.৮।

প্রযুক্তির অবকাঠামোগত ঘাটতির সাথে আছে নাগরিকদের ডিজিটাল দক্ষতারও অভাব। সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি ই-গভর্ন্যান্সের পথকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলেছে। প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী সেবা নিতে গিয়ে নিজেদের অনিরাপদ বোধ করেন। ৬১ শতাংশ নারী ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। এটি নাগরিকের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। কোনো অনিয়ম বা হয়রানির শিকার হলে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থার অভাব নাগরিকদের আরো নিরুপায় করে তুলছে।

ডিজিটাল ব্যবস্থা মানে কেবল কয়েকটি সেবা অনলাইনে চালু করা বা কিছু প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দেয়া নয়। সেবা প্রক্রিয়ার আবেদন, যাচাইকরণ, ফি প্রদান থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সনদ পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নিরাপদ ‘একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে’ নিয়ে আসা প্রয়োজন। এর জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য আইসিটি অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। নাগরিকদেরও ডিজিটাল প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই কাজগুলো করতে না পারলে ই-গভর্ন্যান্সের নামে অপচয় ও ভোগান্তির চক্র শেষ হবে না।

আমরা আশা করি, এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত গোলকধাঁধা দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে সরকার।