উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর বগুড়া। এই শহরে সড়কের পাশে জমে থাকে ময়লার স্তূপ। এই স্তূপ থেকে ছড়ায় উৎকট গন্ধ। কাক-কুকুর এসে টানাটানি করে, বর্জ্য ছড়িয়ে দিয়ে যায় মাঝ সড়কেও। আবার নালা দিয়ে সেসব বর্জ্য গিয়ে নামছে করতোয়া নদীতে। বগুড়া শহরের এই বেহাল দশা নিয়ে প্রতিবেদন করেছে সহযোগী একটি দৈনিক।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বাসাবাড়ি, বাজার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ২৫০ টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এসব বর্জ্য ডাম্পিংয়ের স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেই। শহরের ১৭টি অস্থায়ী ট্রান্সফার স্টেশনেই দিনের পর দিন জমে থাকছে বিপুল আবর্জনা।
বগুড়া শহরের বনানী, ঠনঠনিয়া, সেউজগাড়ী বা রেলস্টেশনের মতো ব্যস্ত এলাকাগুলোতে অস্থায়ী ট্রান্সফার স্টেশন আছে। কিন্তু এগুলো মূলত ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এতে একদিকে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। এতে শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, সঙ্কটে পড়েছে প্রাণ।
২০০৭ সালের আগে শহরের মহল্লায় মহল্লায় স্থায়ী ডাস্টবিন ছিল। তখন পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো তুলে দেয়া হয়। চালু হয় ভ্রাম্যমাণ ডাস্টবিন ও সিবিওভিত্তিক বর্জ্য সংগ্রহ। পরিকল্পনা ছিল— বর্জ্য সংগ্রহের পর সেগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করা হবে। আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট তৈরি করা হবে। সেই পরিকল্পনা গত প্রায় দুই দশকেও বাস্তবায়ন হয়নি। এখন বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে স্রেফ শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। কাক-কুকুরের টানাটানি এবং বৃষ্টির পানিতে বর্জ্যরে বিষাক্ত উপাদান গড়িয়ে পড়ছে করতোয়া নদীতে। নগরের সবচেয়ে বড় ভাগাড় হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বাঘোপাড়ার একটি স্থান। সেটিও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি। দীর্ঘমেয়াদে সেখানে বর্জ্য ফেলা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গৃহস্থালি ও হাসপাতাল বর্জ্যরে সিসা, ক্যাডমিয়াম, সালফার ও নাইট্রোজেনের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিকে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। বাতাস, পানি ও মাটিতে মারাত্মকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যা নগরবাসীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য ব্যাধির কারণ হচ্ছে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনে জনবল সঙ্কট আছে বলে দায়িত্বশীল একজনকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ৬৭১ পদের বিপরীতে মাত্র ৩১৭ পদে লোক আছে। তাছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাবও বাস্তব সমস্যা। কিন্তু বছরের পর বছর এই অবস্থা চলতে থাকবে, সেটিও মেনে নেয়ার নয়। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস বা জৈবসার তৈরির মতো মহাপরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক স্থবিরতা ও উদাসীনতাই নির্দেশ করে। কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে বিভিন্ন সংস্থার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কেবল প্রস্তাব পাঠানোতে সীমাবদ্ধ থাকলে এই সঙ্কটের সমাধান করা যাবে না।
শহরের বুকে বর্জ্য রেখে ‘পরিচ্ছন্ন শহর’ গড়ে তোলা অসম্ভব। এর জন্য দ্রুত জমি অধিগ্রহণ ও আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণ করতে হবে। বর্জ্য পৃথকীকরণ (প্লাস্টিক, পচনশীল ও চিকিৎসা বর্জ্য আলাদা করা) নিশ্চিত করে বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট চালু করা জরুরি। বগুড়াবাসীকে দুর্গন্ধ, দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত করতে একসাথে কাজ করতে হবে স্থানীয় নগর প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে।