রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ জনপ্রশাসন। রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম, নাগরিকসেবা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রশাসনের দক্ষতা, সততা ও পেশাদারত্বে। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনপ্রশাসনকে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে রেখে মেধা, যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিচালনা করা সুশাসনের মৌলিক শর্ত।
এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে মেধাভিত্তিক, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি জনমনে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। সেখানে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণকে যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি করার কথা বলা হয়েছিল। প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন এবং যুগোপযোগী সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট প্রণয়নের কথাও ছিল। কিন্তু সরকার গঠনের ছয় মাস পরও এসব অঙ্গীকারের দৃশ্যমান বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের ওএসডি করা। গুরুত্বপূর্ণ পদে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়া। পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়নের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ এসব অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মজীবনের প্রশ্ন নয়; এর সাথে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জনগণের সেবা পাওয়ার অধিকার সরাসরি যুক্ত।
আমরা মনে করি, অতীতের দলীয়করণের সংস্কৃতির সমালোচনা করে ক্ষমতায় এসে একই ধরনের চর্চা অব্যাহত রাখলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতির কোনো অর্থ থাকে না। একটি দলের সমর্থক সরিয়ে অন্য দলের লোক বসানো জনপ্রশাসন সংস্কার নয়। এটি শুধু দলীয়করণের চরিত্র পরিবর্তন। প্রকৃত সংস্কার হলো এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাÑ যেখানে কোনো কর্মকর্তার সততা, দক্ষতা, কর্মদক্ষতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা হবে তার মূল্যায়নের ভিত্তি। মেধাভিত্তিক প্রশাসন মানে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন নয়। একজন যোগ্য কর্মকর্তাকে সঠিক দায়িত্বে নিয়োগ দেয়া। তাকে কাজের পরিবেশ তৈরি করে দেয়া। সেই সাথে চাই কাঠামোগত সংস্কার। কারণ, নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং ভালো কাজের স্বীকৃতি, এসব কিছুর সমন্বয়ে মেরিটোক্র্যাসি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের জনপ্রশাসনের সঙ্কট এক দিনের নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বহু সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ এবং ক্ষমতাসীনদের প্রশাসনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতায় কাক্সিক্ষত পরিবর্তন স্থায়ী হয়নি। ফলে বর্তমান সরকারের সামনে কাজটি নিঃসন্দেহে কঠিন। তবে সুস্পষ্ট পথনকশা এই কঠিন কাজ সহজ করতে পারে। এ জন্য চাই একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কারকাঠামো গড়ে তোলা। সবচেয়ে বড় কথা, জনপ্রশাসনকে কোনো রাজনৈতিক সরকারের ‘নিজস্ব প্রশাসন’ হিসেবে দেখার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। বর্তমান সরকার যদি সত্যি অতীতের দলীয়করণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাহলে মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তাদের আস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হতে পারে পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
দেশের জনগণ আর দলের প্রশাসনিক আধিপত্য দেখতে চায় না। তারা চায় দক্ষ, নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব প্রশাসন। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি তাই শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে থাকলে চলবে না। মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ জনপ্রশাসন যত বেশি পেশাদার ও মেধাভিত্তিক হবে, গণতন্ত্র ও সুশাসনের ভিত্তি তত শক্তিশালী হবে।