অস্থির মিয়ানমার ক্রমে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশটির জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে উৎখাত করে বাংলাদেশে ঠেলে দিলেও সীমান্তে একধরনের স্থিতাবস্থা বজায় রেখেছিল। উভয় সরকারের মধ্যে একটি ন্যূনতম বোঝাপড়ার সম্পর্ক ছিল। ফলে আন্তঃসীমান্ত বিরোধ ও নানা সমস্যার একটি সমাধান পাওয়া যেত। আরাকান আর্মিসহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছে জান্তা সরকার সীমান্তের কাছে পরাস্ত হলে এক নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এতে সীমান্তসংলগ্ন নাফ নদী এবং বঙ্গোপসাগরে মৎস্য আহরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায়ই আরাকান আর্মি হামলা চালাচ্ছে বাংলাদেশী জেলেদের ওপর। ধরে নিয়ে বন্দী করে রাখছে মাসের পর মাস।
গত পাঁচ মাসের হিসাবে টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন জলসীমা থেকে আরাকান আর্মি ৪২০ বাংলাদেশী জেলেকে তুলে নিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক জলসীমা অতিক্রম করে ভিন্ন দেশে ঢুকে যাওয়া অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য। তবে ভুলক্রমে জেলেরা অন্য দেশের জলসীমায় ঢুকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বোঝাপড়া থাকলে যোগাযোগের মাধ্যমে জেলেদের সহজে ফিরিয়ে আনা যায়। আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত জলসীমায় একটি বৈরী পরিবেশ বিরাজ করছে। বাংলাদেশের জেলেরা ভুলে মিয়ানমারে প্রবেশ করলে রেহাই পাচ্ছেন না। আরাকান আর্মি বাংলাদেশের ভেতরের জলসীমায় মাছ ধরারত জেলেদেরও তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আইনের কোনো তোয়াক্কা করছে না। এ দিকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর জেলেদের উদ্ধারে যোগাযোগের সহজ চ্যানেলও পাওয়া যায় না। শুধু তাই নয়, প্রায়ই বাংলাদেশী জেলেদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে আরাকান আর্মি। এতে অনেকে হতাহত হচ্ছেন।
এই সশন্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বেআইনি কর্মকাণ্ডের বড় ভুক্তভোগী বাংলাদেশী দরিদ্র জেলে পরিবারগুলো। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনেক পরিবার দিনহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছে। দুরবস্থা আরো বেড়ে যায়, যখন এসব পরিবারের ওপর জেলেদের নেয়া দাদনের টাকা পরিশোধের দায় পড়ে। টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে এ ধরনের শত শত পরিবার রয়েছে। এখন মিয়ানমারের জলসীমার কাছে মৎস্য আহরণে নিযুক্ত জেলেদের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করছে। মৎস্য আহরণেও এর প্রভাব পড়ছে। আরাকান আর্মির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো প্রতিবাদ নেই। সরকারেরও অনেকটা গাছাড়া ভাব। মাসের পর মাস চলে যাচ্ছে জেলেদের উদ্ধারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।
আরাকান অর্মি একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী। এরা মিয়ানমারের জান্তা সরকারের চেয়ে শক্তিশালী কোনো পক্ষ নয়। তারপরও জেলেদের উদ্ধারে সরকার কেন ব্যর্থ হচ্ছে, তার কোনো সদুত্তর নেই। বাংলাদেশ সরকার আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে ওই অঞ্চলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি বাড়াবাড়ি করতে সাহস পেত না। সেখানে উল্টো আমাদের জেলেদের ওপর চড়াও হচ্ছে। এ ছাড়া তাদের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডে সীমান্তের স্থল অংশেও বেসামরিক নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের ছোড়া অস্ত্র সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে পড়ছে। এ অবস্থায় নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
আমরা মনে করি, আরাকান আর্মির হাতে বন্দী জেলেদের জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারে সরকার ব্যবস্থা নেবে। সেই সাথে প্রতিনিয়ত যে আক্রমণাত্মক আচরণ করছে আরাকান আর্মি; তা বন্ধেও উদ্যোগ নিতে হবে। যেকোনো মূল্যে আমাদের সীমান্ত নিরাপদ রাখতে হবে।