ধ্বংসের মুখে চর তুফানিয়ার সৌন্দর্য
Printed Edition
রফিকুল হায়দার ফরহাদ চর তুফানিয়া (পটুয়াখালী) থেকে ফিরে
‘হায় হায়! বিচের সব গাছ দেখি মরে গেছে। লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণতো আর দেখি না।’ ২০২২ সালে চর তুফানিয়ায় সফরে যাওয়া এক পর্যটক এবার ফের এ চরে গিয়ে এভাবেই বিস্মিত হয়েছেন। কারণ সাগর পাড়ের অধিকাংশ গাছই মরে গেছে। আর লাল কাঁকড়া যে অংশে অবাধে বিচরণ করতো সেগুলোও নেই। হালকা কাদাবালির যে কয়েক কিলোমিটার এলাকা ছিল সেটিও বিলীন। এ পর্যটক হতাশা নিয়ে চর তুফানিয়া ঘুরে দেখলেও দ্বীপটির সৌন্দর্য দেখে মহাখুশি রংপুর ও গাজীপুর থেকে যাওয়া দুই তরুণ পর্যটক আশিক ও রাব্বী। কারণ তারা এ প্রথম সেখানে গিয়ে যে সৌন্দর্য দেখেছেন তাতেই অভিভূত। চর কাশেমের সাগর পাড়ের সবুজ ঘাসের গালিচা পেরিয়ে তারা এসেছিল চর তুফানিয়াতে। চর কাশেম ও চর তুফানিয়াকে বিভক্ত করেছে একটি বড় খাল। আর চর তুফানিয়ার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে আরেকটি খাল। এ খাল দিয়ে চরটির দক্ষিণ পার্র্শ্বের বিচে যাওয়া যায়। আমরা যখন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সেখানে পৌঁছালাম, তখন সে খালে জোয়ার। ফলে টইটুম্বুর খালের পানি , এক প্রান্তের সবুজ বন সে খালে ভাসতে থাকা বাইন বা ছৈলা গাছের ফল মুগ্ধই করছিল নতুন পটর্যটকদের। সাথে বনের ভেতর থেকে আসা পাখির ডাকের শব্দ আরো বিমোহিত করছিল। চর হেয়ার থেকে আগুনমুখা নদী পেরিয়ে সাগরের মোহনা দিয়ে সেখানে যেতে আমাদের ঘণ্টাখানেক লেগে যায়। সকাল সকাল চর তুফানিয়ায় যাওয়ার জন্য আমরা চর হেয়ারেই সাগর পাড়ে ট্রলারে রাত্রি যাপন করেছি।
২০২২ সালে আমি যখন প্রথম সেখানে যাই তখনকার সৌন্দর্যের সাথে এখনকার প্রাকৃতিক নিস্বর্গের অনেক তফাৎ। তখন আমরা প্রায় এক কিলোমিটার প্রশস্ত সাদা বালির বিচ ডিঙিয়ে বনের কাছে যেতে পারিনি। কারণ প্রথমত, বিচে ছুটে চলা লাল কাঁকড়া তাড়া করতে করতেই সময় শেষ। সাথে ছিল কিছুটা গরম। তা ছাড়া এতো লম্বা পথ সাদা বালি পেরিয়ে যাওয়াটা কঠিনই। তবে এবার সেই বিচ পেলাম একে বারেই অল্প। প্রশস্ততায় ৫০ মিটারের একটু বেশি। নেই সেই শত শত লাল কাঁকড়া। মরে গেছে বন বিভাগের লাগানো ঝাউ গাছের সারি। বিচটিও আগের মতো সমতল নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা বেড়েছে। মোটকথা চার বছর আগের সেই সৌন্দর্য আর নেই।
এ চর তুফানিয়াতে ২০২২ সালে যাওয়াটা ভুল করে। যাওয়ার কথা ছিল জাহাজমারার চরে। কিন্তু সাগরে চলমান ভাটা এবং এ ভাটার কারণে ডুবোচরে ট্রলার বারবার আটকে যাওয়ায় মাঝি দিক হারিয়ে ফেলে। তখন মাঝিই প্রস্তাব দেয় বিকল্প হিসেবে চর তুফানিয়াতে যাওয়ার। তাদের প্রস্তাব ছিল এ রকম। ‘স্যার ভুল হয়ে গেছে। এখন ভাটা। সাগরের এ অংশ দিয়ে আর যাওয়া যাবে না। জোয়ার আসতে আসতে আরো তিন ঘণ্টা। বরং চলেন আপনাদের আরেকটি চরে নিয়ে যাই। দেখতে বেশ সুন্দর। আমরা মাঝে মাঝে এ চরে বিশ্রাম নেয়ার জন্য আসি।’ তার প্রস্তাব মতো গিয়ে আমরা অভিভূত হয়ে যাই। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল সাদা বালির বিচ আর পেছনে সবুজ বন। আমরা যখন ট্রলার থেকে লাফিয়ে সাগরের হাঁটু সমান পানিতে নামি তখন বীচের হালকা ভেজা অংশে শত শত লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি। আমাদের দেখেই লুকিয়ে গেল বালির গর্তে।
এবার পেলাম না সে লাল কাঁকড়া। তবে অন্য জাতের ছোট ছোট কাঁকড়ার গর্ত দেখেছি। বিচের হালকা ভেজা অংশের পরিমাণ কমে যাওয়াতেই হয়তো কাঁকড়াগুলো অন্যত্র ঠিকানা গড়েছে। এই হতাশা নিয়ে যখন বীচের আরো কিছু অংশ হেঁটে সামনে এগুলাম তখন কষ্টটা আরো বাড়লো। বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে মরে গেছে বনের গাছ। মনে হবে কেউ পুড়ে ফেলেছে গাছগুলো। সাদা বালির ওপর মরে আছে শত শত গাছ। গাছগুলোর গোড়ায় এবং আশপাশে মরা ডালে ভরা। এতে সাদা বালির বিচের সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে। সেখানে খালি পায়ে হাঁটাও কঠিন। কিছু গাছ আবার জেলেরা কেটে নিয়েছে। জন মানবহীন এ সব বনের গাছতো নানা কাজেই ব্যবহৃত হয়। মরা গাছগুলোর পেছনেই গোলপাতা বন। সেই গোলপাতা বনও মরে যাচ্ছে। সাথে থাকা মাঝি শহীদুল হাওলাদার জানান, এই গাছ গুলো মারা যাওয়ার কারণ অতিরিক্ত বালির উপস্থিতি। জোয়ার বা ঢেউ এর সময় এই বালি গুলো এসে জমে গেছে গাছের গোড়ায় গোড়ায়। এতেই গাছগুলোর এই করুণ দশা। গোলপাতা গাছের গোড়া কাদাপানিতে ডুবে থাকে। আমরা যে মরা গোলপাতা গাছ দেখলাম সেগুলোর গোড়া বালিতে ঢেকে গেছে। সে মরা গাছগুলোর পেছনে যে গাছের গোড়াতে এখনো বালি পড়েনি বেঁচে আছে সেগুলো। তবে এভাবে প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশগত বিপর্যয় চলতে থাকলে আরো হুমকির মুখে পড়বে চর তুফানিয়ার সৌন্দর্য।
এ চর তুফানিয়ার অবস্থান পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায়। চর কাশেমের পরেই এ দ্বীপের অবস্থান। উপকূলীয় এলাকার জনগণ এবং জেলেরা ঢেউকে তুফান বলে। চর তুফানিয়া জেগে ওঠার আগে এ এলাকায় সাগরে প্রচুর ঢেউ হতো। সে ঢেউগুলো ছিল বিশাল বিশাল। তাই এ চরের নামকরণ চর তুফানিয়া। এ দ্বীপের উত্তর পূর্বে চর হেয়ারের অবস্থান। পশ্চিমে জাহাজমারার চর। আর চর তুফানিয়ার দক্ষিণপূর্বে জেগে উঠেছে মায়া চর। চর তুফানিয়ার বনে মহিষসহ আছে শিয়াল। পাখিদের মধ্যে সামুদ্রিক পাখি, এ ছাড়া পাতি তিসা বাজ, সাদার উপর কালো ফোটা ফোটা রঙের মাছরাঙার দেখা মিলবে এখানে। আর সাদা বকের সারিতো আছেই।
প্রতিটি দ্বীপ বা চর জেগে উঠলে সেখানে উপকূলীয় গাছ লাগায় বন বিভাগ। চর তুফানিয়াতেও সে বনায়ন। কেওড়া, বাইন, গোলপাতা, হরগোজা, গেওয়া গাছের দেখা মিলেছে। একটি জায়গার একটি পুড়ে যাওয়া মৌচাক দেখতে পেলাম। বন থেকে কেউ কেটে এনেছে তা। উপকূলীয় বনে জন্মানো গাছের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌচাক বানায় মৌমাছি। আমি ও আমাদের নয়া দিগন্তের রাঙ্গাবালী প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম বনের মধ্যে কিছু দূর হেঁটে গেলাম। তবে নিরাপত্তার কারণে বেশি দূর এগোতে পারিনি। বনে সাপ আছে। বন্য মহিষের পায়ের অসংখ্য তাজা ছাপ চোখে পড়ল। মহিষের নির্দিষ্ট হাঁটা পথ ধরেই আমরা কিছুটা এগিয়ে আর সাহস পাইনি। শিয়ালতো আছেই। প্রচুর ঘুঘু পাখি আছে। পুরো বনে তখন আমরা দুইজনই। সাগর পাড়ে তখন দু’টি ট্রলার। একটিতে আমরা এসেছি। অন্যটি সাগরে জাল ফেলে তীরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এ চর তুফানিয়ায় কম পর্যটকই যান। তা সোনার চর বা চর হেয়ার ঘুরতে যাওয়া পর্যটকরা ট্রলারের মাঝিদের প্রস্তাবেই যান। কেউ আবার কুয়াকাটা থেকে আসেন।
থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই চর তুফানিয়াতে। খাবারের ব্যবস্থার প্রশ্নই আসে না। সাথে করেই খাবার দাবার নিতে হবে। ট্রলারে রান্না করা। সাথে পর্যাপ্ত খাবারের পানি ও রান্না করার জন্য মিঠা পানি নিতে হবে। আমরা চর তুফানিয়াতে দুপুরে খাবারের জন্য তিনটি ছোট সাইজের ইলিশ এবং একটি টেংরা মাছ (গুইশা টেংরা জাতের মাছ) কিনলাম চারশত টাকা দিয়ে। আমরা যতবারই ট্রলার থেকে চরে নেমেছি মাঝি শহীদুল হাওলাদার নামেননি। তিনি ট্রলারে রান্নাবান্না করেছেন। টেউ যেকোনো সময় ট্রলারের অবস্থান বদল করে দেয়, যদিও নোঙর ফেলা থাকে। তা ছাড়া অন্য ট্রলারের কেউ চুরিও করতে পারে। সাগরের কিছু মাঝি চুরি নয়, রীতিমতো ডাকাতি করে। তাদের খুন করতেও বাধে না।
তিন থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার আয়তনের এ চর তুফানিয়া। সাদাবালি, ঘন সবুজ বনের সাথে সাগরের আছড়ে পড়া ঢেউ যেকোনো পর্যটককেই মুগ্ধ করবে। গাজীপুরের মাওনা থেকে যাওয়া পর্যটক ফজলে ওয়াহেদ রাব্বী চর তুফানিয়ার সৌন্দর্যে বিমোহিত। তার মতে, আমরা মাঝির সতর্কতার কারণে সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারিনি। কারণ সাগরে ভাটা শুরু হলে ট্রলার নিয়ে ফেরা কঠিন। এরপরও অল্প সময়ে আমরা সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখেছি তা এক কথায় অসাধারণ। সাদা বালির বালুকাময় বিচ, সবুজ বন, পাখির শব্দ, চরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ভরা খাল সবই আকৃষ্ট করেছে। চর তুফানিয়ার সৌন্দর্য সহজে ভোলার নয়।