গাজা ফ্লোটিলার কর্মীদের আটকাদেশ আরো বাড়িয়েছে ইসরাইল
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গত সপ্তাহে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের হাতে অপহৃত গাজাগামী মানবিক সহায়তা ফ্লোটিলার দুই কর্মীর আটকাদেশ বাড়িয়েছে একটি ইসরাইলি আদালত। একটি ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে। আদালাহর আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেসি সমন্বয়কারী মিরিয়াম আজেম আল জাজিরাকে নিশ্চিত করেছেন যে, গতকাল মঙ্গলবার আশকেলন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্পেনের সাইফ আবু কেশেক এবং ব্রাজিলের থিয়াগো আভিলার আটকাদেশ আগামী ১০ মে রোববার পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রের আবেদন মঞ্জুর করেছে।
এই দু’জন সেই কয়েক ডজন কর্মীর মধ্যে ছিলেন যারা ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’-এর অংশ হিসেবে গাজার উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। গত ৩০ এপ্রিল গ্রিসের আন্তর্জাতিক নৌসীমায় ইসরাইলি বাহিনী ফ্লোটিলাটিকে আটক করে। আয়োজকরা জানান, ১৮০ জন কর্মীর মধ্যে অধিকাংশকে ক্রিটে নিয়ে যাওয়া হলেও আবু কেশেক এবং আভিলাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইসরাইলে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তারা এখনো আটক রয়েছেন।
‘আন্তর্জাতিক নৌসীমা থেকে অপহৃত মানবিক কর্মীদের আটকাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর আদালতের সিদ্ধান্তটি রাষ্ট্রের আইনহীনতার বিচারিক বৈধতা দেয়ার শামিল,’ গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে আদালাহ এ কথা বলেছে এবং আরো জানিয়েছে যে তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবে।
আদালাহ বলেছে, কর্মীদের আটকাদেশের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে ‘গোপন প্রমাণের’ ভিত্তিতে, যা আবু কেশেক, আভিলা এবং তাদের আইনজীবীদের পর্যালোচনা করার অনুমতি দেয়া হয়নি। সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালত জিজ্ঞাসাবাদের সময়কালের ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা বা বিচারিক বাধা আরোপ না করেই রাষ্ট্রের অনুরোধ করা পুরো ছয় দিনের মেয়াদ বৃদ্ধি মঞ্জুর করেছে।’
আদালাহ এর আগে আল জাজিরাকে জানিয়েছিল, এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি, তবে আবু কেশেক এবং আভিলার বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতা এবং বিদেশী এজেন্টদের সাথে যোগাযোগ’সহ বেশ কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে।
এই মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, ‘যেহেতু কর্মীদের গাজা থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে অপহরণ করা হয়েছিল এবং তারা ইসরাইলি নাগরিক নন, তাই ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ আইন তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’
সংস্থাটি আরো বলেছে যে, উভয় আন্দোলনকর্মীই ‘সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন, তাদের সেলে তীব্র আলোর নিচে রাখা হচ্ছে এবং ডাক্তারি পরীক্ষাসহ যখনই তাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানো হয়, তখন তাদের চোখ বেঁধে রাখা হয়।’
সংস্থাটি জানিয়েছে, ৩০ এপ্রিল অপহরণের পর থেকে আন্দোলনকর্মীরা শুধুমাত্র পানি পান করে তাদের অনশন ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন। ফ্লোটিলার আয়োজকরা আবু কেশেক ও আভিলার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দলটি এক্স-এ বলেছে, ‘জায়নবাদী সরকার আবারো আমাদের বন্ধু সাইফ আবুকেশেক এবং থিয়াগো আভিলার অবৈধ আটকাদেশের মেয়াদ বাড়িয়েছে।’
‘আমাদের আয়োজকদের আন্তর্জাতিক নৌসীমা থেকে অবৈধভাবে অপহরণ করা হয়েছে, গ্রিক জলসীমায় তাদের ওপর মারধর ও নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অধিকৃত ফিলিস্তিনে নিয়ে আসা হয়েছে, যেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ, মৃত্যুর হুমকি, নিদ্রাহীনতা এবং চিকিৎসার অবহেলার শিকার হতে হয়েছে।’
শনিবার, আদালার আইনজীবীরা আশকেলনের শিকমা কারাগারে আন্দোলনকারীদের সাথে দেখা করেছিলেন, যেখানে তারা ‘নির্যাতনের সমতুল্য গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের’ সাক্ষ্য দেন। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার গাজায় প্রথম যাত্রা বিশ্বজুড়ে মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল, কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে ইসরাইলি বাহিনী মিসর ও গাজা উপকূলে নৌকাগুলোকে আটক করে। সুইডিশ আন্দোলনকারী গ্রেটা থুনবার্গসহ নৌকার নাবিকদের ইসরাইলি বাহিনী গ্রেফতার করে এবং বহিষ্কার করে।
নিহত বেড়ে ৭২ হাজার ৬১৫, হামলা অব্যাহত
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় নিহত বেড়ে ৭২ হাজার ৬১৫ জনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। আজকেও গাজা সিটির আল-আইউন এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসার জন্য দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার সকালে একদল মানুষের ওপর এই ড্রোন হামলা চালানো হয়।
চিকিৎসা সূত্রের বরাতে ওয়াফা আরো জানিয়েছে, এই হামলায় বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছে। তাদের চিকিৎসার জন্য দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তিনজনের লাশ হাসপাতালে আনা হয়েছে, যার মধ্যে একজনকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরো ১১ জন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় গাজায় নিহতের মোট সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৬১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছে অন্তত এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষ। কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এখনো হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে, যাদের অনেকের সন্ধান মেলেনি। অব্যাহত হামলা ও উদ্ধার সরঞ্জামের সঙ্কটের কারণে তাদের খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাজায় অঙ্গহারানো প্রতি ৫ জনের একজন শিশু : জাতিসঙ্ঘ
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অঙ্গহারানো প্রতি পাঁচজন ব্যক্তির মধ্যে একজন শিশু বলে সতর্ক করেছে জাতিসঙ্ঘ। কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন বিশেষজ্ঞের তীব্র সঙ্কট এবং চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে হাজার হাজার মানুষ পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক এই তথ্য জানান। তিনি জানান, কীটপতঙ্গ ও ইঁদুরের কারণে চর্মরোগসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে এবং ছয় হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষের কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন ও পুনর্বাসনসেবা প্রয়োজন। দুজারিক জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে অঙ্গহারানো হাজার হাজার মানুষ এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তাদের সেবা দেয়ার জন্য মাত্র আটজন কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন কারিগরি বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের তীব্র সঙ্কট এবং কৃত্রিম অঙ্গের সরঞ্জাম প্রবেশে কড়াকড়ির কারণে বর্তমান চাহিদা মেটাতে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় লাগতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ‘অঙ্গ হারানো প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন শিশু।’ ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধের কারণে চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে দুজারিক বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন কারিগরি বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। সেইসাথে কৃত্রিম অঙ্গের সরঞ্জাম বাধাহীনভাবে প্রবেশ করতে দেয়া উচিত।’ ২০০৭ সাল থেকে গাজা উপত্যকায় কঠোর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে ইসরাইল। এর ফলে ভূখণ্ডটির ২৪ লাখ মানুষ প্রায় অনাহারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন।
ইসরাইলি দখল অব্যাহত
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও ইসরাইল তাদের দখল বিস্তৃত করে প্রায় ৫৯ শতাংশ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে জানিয়েছে দেশটির আর্মি রেডিও। ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির আগে এই দখলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস দাবি করেছে, বাস্তবে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা গাজায় আবার যুদ্ধ শুরু করার পক্ষে জোর দিচ্ছেন এবং বর্তমান সময়কে হামাসকে পরাজিত করার জন্য উপযুক্ত মনে করছেন। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে। দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা কমিয়ে গাজা ও পশ্চিমতীরে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে এবং দক্ষিণ কমান্ড পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছে।