রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব : শামা ওবায়েদ

Printed Edition
back-2
রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব : শামা ওবায়েদ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

‘দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান করাটা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব’ মন্তব্য করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, বাংলাদেশের একার পক্ষে এই সঙ্কটের বোঝা বহন করা সম্ভব না। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে। তবে বাংলাদেশকে যেন একা দাঁড়াতে না হয়।

গতকাল রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) এবং অক্সফাম ইন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সঙ্কটের ১০ বছর : মানবিক সহায়তা থেকে টেকসই সমাধানের পথ’ বিষয়ক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ডিক্যাব সভাপতি একেএম মঈনউদ্দীন এবং অক্সফাম ইন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত সূচনা বক্তব্য দেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের ১০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এখন শুধু ফিরে দেখার সময় নয়, বরং নতুন করে উদ্যোগ নেয়া ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সময়। টেকসই সমাধান ছাড়া আরেকটি দশক পার হতে দেয়া যাবে না। তিনি বলেন, একটি সরকারের জন্য ১০ বছর একটি নীতিচক্র এবং একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি পরিকল্পনার সময়সীমা। কিন্তু শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর জন্য ১০ বছর মানে পুরো শৈশব-কৈশোর, একজন তরুণের জন্য এটি হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার সুযোগ, একটি পরিবারের জন্য এটি ভূমিহীন জীবন এবং একটি পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম। আমরা ১০ বছরকে ২০ বছরে পরিণত হতে দিতে পারি না।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের পর থেকে বাংলাদেশ তার সীমান্ত ও হৃদয় উন্মুক্ত রেখেছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিজস্ব উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ, সীমিত ভূমি ও উচ্চ জনঘনত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশ বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে। বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের অবকাঠামো, পরিবেশ, জনসেবা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তারপরও মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে আমরা রোহিঙ্গাদের খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। তবে বাংলাদেশের এই মানবিক উদারতা আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। যে সঙ্কট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি, সেই সঙ্কটের সমাধান বাংলাদেশ একা করতে পারে না।

রোহিঙ্গাদের জন্য জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের আওতায় আন্তর্জাতিক তহবিলের পরিমাণ কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অর্থায়ন কমলেও মানবিক সহায়তার প্রয়োজন অপরিসীম। খাদ্য, পুষ্টি, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুরক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়। এগুলো রোহিঙ্গাদের জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান। বড় ধরনের তহবিল ঘাটতি হলে এর প্রভাব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, ক্যাম্পের স্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়বে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তায় ক্লান্তি যেন মানবিক পরিত্যাগে পরিণত না হয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের জীবিকা, পরিবেশ ও জনসেবা দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে। মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তাকে ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। এর টেকসই সমাধানও শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারেই খুঁজে বের করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক পছন্দ নয়, এটিই একমাত্র টেকসই পথ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নিজেরাও বারবার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছে। শরণার্থী শিবির কখনোই নিজস্ব মাতৃভূমির স্থায়ী বিকল্প হতে পারে না।

সংলাপে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, চীনের ডেপুটি চিফ অব মিশন লিউ ইউইন, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) বাংলাদেশ মিশন প্রধান ড. লরা টমবন্ডে, সেন্টার ফর অলটারনেটিভসের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মুর্শেদ চৌধুরী এবং ডিক্যাবের সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস বক্তব্য রাখেন।