ট্রাইব্যুনালে আশরাফ কায়সার
১৪০০ মানুষ হত্যার বিচার না হলে ফিরবে ফ্যাসিবাদ
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চাঞ্চল্যকর জবানবন্দী দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার। তিনি বলেছেন ক্যাডারদের হাতে প্রাণ গেছে ১৪০০ মানুষের, বিচার না হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে চলা এ মামলায় গতকাল রোববার বেলা ১১টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেলে উপস্থিত হয়ে ২৭ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ট্রাইব্যুনালকে জানান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের সরাসরি নির্দেশে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডার এবং সরকারি বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে প্রায় ১৪০০ মানুষের প্রাণ গিয়েছে এবং ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে গড়ে ওঠা এই চরম ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সাথে গণতন্ত্র কোনোভাবেই একসাথে চলতে পারে না; তাই এই নজিরবিহীন গণহত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে দেশে আবারো রক্তক্ষয়ী গণবিরোধী ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে।
বিচারপতি মো: মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে (অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর) সাক্ষ্য দানকালে আশরাফ কায়সার তার ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ শীর্ষক বইয়ের সঙ্কলনটি প্রদর্শন (প্রদর্শনী-১১৯) করেন।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামসহ প্রসিকিউশন প্যানেলের উপস্থিতিতে তিনি তার জবানবন্দীর সূচনাতেই আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে ফ্যাসিবাদের শিকড় কিভাবে ডালপালা মেলেছিল, তার একটি ঐতিহাসিক খতিয়ান উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পরপরই তৎকালীন সরকার ভিন্নমত দমনে জাসদ ও সর্বহারা পার্টির ওপর চড়াও হয়। জয় বাংলা বাহিনী, লাল বাহিনী ও রক্ষী বাহিনীর মতো মিলিশিয়া বাহিনী তৈরি করে মানুষের অধিকার পদদলিত করা হয়। এমনকি ১৯৭৩ সালে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মণির প্রকাশ্যে ‘সহিংস রাজনীতিতে বিশ্বাস’ করার জবান এবং ১৯৭৫ সালে সিরাজ সিকদার হত্যার পর সংসদে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য প্রমাণ করে যে, দলটির ভেতরেই সহিংস রাজনীতি গভীরভাবে প্রথিত ছিল যার চূড়ান্ত রূপ দেখা গিয়েছিল একতরফা নির্বাচন, মিডিয়া বন্ধ ও বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
ঐতিহাসিক সেই ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলকে মূল্যায়ন করে জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ১৯৭২-৭৫-এর সেই একই দমনমূলক চরিত্র ২০০৮ সালের পর আবার পূর্ণ রূপ পায়। পিলখানা হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন ও ‘আয়না ঘর’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিরোধী মতামত পিষে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি ভোট’-এর মাধ্যমে এ দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনব্যবস্থাকে স্রেফ কবরে পাঠানো হয়। এর পাশাপাশি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ, অর্থনীতিতে লুটপাট ও বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সিভিল প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ক্যাডারভিত্তিক দলীয়করণ করে দেশের ওপর এক শ্বাসরুদ্ধকর ভয় ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়।
এই দীর্ঘ দুঃশাসনের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে, যেখানে পতন ঠেকাতে গিয়ে চরম বর্বরতার পথ বেছে নেয় তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা। জবানবন্দীতে আশরাফ কায়সার জুলাই গণহত্যার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে জানান, ছাত্রদের যুক্তিসঙ্গত কোটা আন্দোলন দমনে সরকার যখন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়, তখন ওবায়দুল কাদের প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন ‘ছাত্রদের আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগই যথেষ্ট’। এই উসকানিমূলক নির্দেশের পরদিনই দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-জনতা ও বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা। পরিস্থিতির অবনতি হলে ওবায়দুল কাদের ও ১৪ দলীয় জোটের নেতারা গণমাধ্যমের সামনে এসে ‘শুট অ্যান্ড সাইট’ বা জীবনঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রত্যক্ষ ঘোষণা দেন, যা মূলত আন্দোলনকারীদের পাখির মতো গুলি করে মারার সবুজ সঙ্কেত ছিল।
ট্রাইব্যুনালে পলাতক সাত আসামির সরাসরি অপরাধের চিত্র তুলে ধরে সাক্ষী বলেন, ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামি বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও ওয়ালি আসিফ ইনান তাদের অধীনস্থ ক্যাডারদের আন্দোলনকারীদের ওপর সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ ও সহিংস আক্রমণের নির্দেশ দিতে থাকেন। ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে এদের সরাসরি উপস্থিতি ও গুলিবর্ষণের ভিডিও প্রমাণ বিদ্যমান। জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে কিভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও শ্রমিক লীগের মিলিশিয়াদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দিয়ে ১৪০০ তাজা প্রাণ কেড়ে নেয়া হয়েছে।
জবানবন্দীর শেষ পর্যায়ে এই অভিজ্ঞ সাংবাদিক দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যারা নিহত ও অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন, তাদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে শেখ হাসিনা এবং তার নির্দেশ বাস্তবায়নকারী ওবায়দুল কাদেরসহ উপস্থিত পলাতক আসামিদের এই গণহত্যার সম্পূর্ণ দায় বহন করতে হবে। যদি এবারো তাদের বিচার না করে রাজনৈতিকভাবে পার পাইয়ে দেয়া হয়, তবে আইনের শাসন পুরোপুরি ভেস্তে যাবে এবং বাংলাদেশে আবারো ভিন্ন পোশাকে নতুন কোনো ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে আসবে, যা প্রতিহত করতেই ট্রাইব্যুনালে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
আজ সোমবার ট্রাইব্যুনালে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করবেন।
এর আগে, ৩০ জুন এ মামলার প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কথা ছিল। তবে নতুন করে সাক্ষ্যগ্রহণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন সাক্ষীর জবানবন্দী নেয়া হয়। গত ২৭ এপ্রিল মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। ওই দিন ২৬তম সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তা আহমেদ নাসের উদ্দিন মোহাম্মদকে জেরা করেন আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান। তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছিল ১৯ এপ্রিল।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে সাত আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয়া হয়।