ইইউর পর্যবেক্ষণ চূড়ান্ত প্রতিবেদন
ইঞ্জিনিয়ারিং চোখে পড়েনি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
নির্বাচনে কোনো ধরনের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং আমাদের চোখে পড়েনি। যদি কোনো রাজনৈতিক দলের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে অভিযোগ থাকে, তাহলে তারা আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের পর এই প্রথম নির্বাচন সত্যিকার অর্থে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। মৌলিক স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে সম্মান দেয়া হয়েছে। তবে কিছু বিক্ষিপ্ত, স্থানীয় রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রায়ই বিভ্রান্তিকর অনলাইন বয়ানের মাধ্যমে উস্কে দেয়া মব আক্রমণের অব্যাহত ভীতি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি বলেন, আইনগত ও প্রক্রিয়াগত ঘাটতি রয়ে গেছে। এখন সময় হয়েছে স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সংস্কার প্রক্রিয়ার দিকে নজর দেয়ার। যা জুলাই জাতীয় সনদ এবং এর পরবর্তী সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল মঙ্গলবার ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে মন্তব্যসহ এসব সুপারিশ করেন ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, নির্বাচনী মিশনের ডেপুটি চিফ ইন্তা লেসি ও ইইউ মিডিয়া অফিসার ডোকা। দুই মাসব্যাপী দেশজুড়ে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। ইইউ নির্বাচন মিশন নির্বাচন আরো ভালো করার জন্য ৬টি অগ্রাধিকারসহ ১৯টি সুপারিশ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে আগত মোট ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা বাংলাদেশের সকল ৬৪টি প্রশাসনিক জেলায় মোতায়েন ছিলেন।
ইভার্স ইজাবস বলেন, বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষতার সাথে পরিচালিত নির্বাচন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা সকল অংশীজনের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি একটি যৌথ অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। যদিও নির্বাচন জনআস্থা বৃদ্ধি করেছে। তবুও আইনগত ও প্রক্রিয়াগত ঘাটতি রয়ে গেছে, যা জুলাই জাতীয় সনদ এবং এর পরবর্তী সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
কিছু ইতিবাচক দিক ও অসঙ্গতি
ইইউ মিশনটি বেশ কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেছে, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার প্রমাণ বহন করে। পুনর্গঠিত আইনি কাঠামো অনেকাংশেই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করেছে, স্বচ্ছতা প্রদর্শন করেছে এবং বিদেশে বসবাসরত সাত লাখ ৭০ হাজার ভোটারকে সফলভাবে ভোটাধিকার প্রদান করেছে। নির্বাচনী তদন্ত ও নিষ্পত্তি কমিটিগুলো প্রচারণার নিয়মাবলি বজায় রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির জন্য আরো প্রচেষ্টার প্রয়োজন। এই নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের উপস্থিতি নগণ্য বললেই চলে। যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকে ইঙ্গিত করে। নির্বাচন কমিশনের প্রচারণাবিষয়ক বিধিবিধানের প্রয়োগে অসঙ্গতি এবং প্রচারণার অর্থায়ন সংক্রান্ত আইনের সীমিত তদারকি ও জবাবদিহিতা একটি অসম নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে ঘটিত সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা এবং পুলিশের অপর্যাপ্ত সুরক্ষা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সঙ্কুচিত করেছে। সেই সাথে ডিজিটাল তথ্যের নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর প্রস্তুতিও অপর্যাপ্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
ইইউ বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে
ইভার্স ইজাবস বলেন, সরকারি ও রাজনৈতিক জীবনে নারীদের অংশগ্রহণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন এবং অনলাইনে ও অফলাইনে একটি বহুমাত্রিক ও নিরাপদ জনবিতর্কের পরিবেশ তৈরি করা। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির আলোকে এবং গণতান্ত্রিক নীতিমালার প্রতি আমাদের অবিচল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
ছয়টি অগ্রাধিকারমূলক সুপারিশ
ইইউর ছয়টি অগ্রাধিকারমূলক সুপারিশ হলো, সংসদীয় নির্বাচন পরিচালনাকারী আইনি কাঠামো সংশোধন করা। যাতে অসঙ্গতি ও ফাঁকফোকর দূর করা যায়, বিভাজন হ্রাস করা যায়, আইনি নিশ্চয়তা জোরদার করা যায়। উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে ভোট গণনার সময় স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য স্ক্রিনে ডেটা এন্ট্রি প্রদর্শন এবং সম্পূর্ণ প্রাথমিক ও চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফল অনলাইনে দ্রুত প্রকাশসহ সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সব রাজনৈতিক দল যেন সব অভ্যন্তরীণ দলীয় কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্য অর্জন করে তা নিশ্চিত করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ধারা ৯০খ (১) (খ) (রর) বাস্তবায়নের জন্য কঠোর পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা নেয়া। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলকে কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে বাধ্য করার বিষয়টি বিবেচনা করা।
তথ্যগত ও নির্বাচনী সততা রক্ষার লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক আইনি বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ সংশোধন করে একটি অধিকতর নিরাপদ ও স্বচ্ছ ডিজিটাল জগতকে উৎসাহিত করা। নির্বাচনী প্রচারণার অর্থায়নসংক্রান্ত বিধানগুলো পর্যালোচনা ও শক্তিশালী করা। যাতে ব্যয়ের সীমা ও প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতাগুলো বাস্তবসম্মত, প্রয়োগযোগ্য এবং কার্যকর যাচাই ও তদারকির আওতাধীন হয়। বিদ্যমান অখণ্ড সুরক্ষাব্যবস্থা বজায় রেখে এবং অতিরিক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা অন্বেষণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশে যেসব ভোটার নির্বাচনের দিনে সশরীরে ভোট দিতে অক্ষম, যেমন গৃহে আবদ্ধ ভোটার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি, অভিবাসী শ্রমিক এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের যোগ্যতা সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা। অন্যান্য শ্রেণির ভোটারদের ভোটাধিকার প্রদানের উপযোগী আগাম ভোটদানের মতো অতিরিক্ত ভোটদানের ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।
পোস্টাল ব্যালটে ভোটদান
পোস্টাল ব্যালটে ভোটদান পদ্ধতি নিয়ে সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইভার্স ইজাবস বলেন, প্রবাসীদেরকে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত এবং এটি কোনো সহজ কাজ নয়। ভোটের গোপনীয়তা নিয়ে অবশ্যই উদ্বেগ রয়েছে। অন্য দিকে আমরা অবশ্যই চাই যে বাংলাদেশের নাগরিকরা যারা ভোট দিতে চান, তারা যেখানেই থাকুন না কেন, তারা তা যেন করতে পারেন। প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা দেখলে নিঃসন্দেহে তা বেশ চিত্তাকর্ষক। তিনি বলেন, আমরা সবাই জানি, অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটির আরো উন্নতি করা যেতে পারে। কিন্তু আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে নির্বাচন কমিশন এবং সাধারণভাবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এই প্রক্রিয়ার সবলতা ও দুর্বলতাগুলো কী ছিল এবং কিসের উন্নতি করা যেতে পারে, তা থেকে শিক্ষা নেবে। একই সাথে, আমি মনে করি যে ডাকযোগে ভোটের পেছনের মূল ধারণাটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কারণ মানুষ বিশ্বজুড়ে চলাচল করে এবং এর অর্থ হলো তাদের ইচ্ছা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং তারা যেখানেই বসবাস করুক না কেন, সেখানেও প্রকাশ করা যেতে পারে।