সমুদ্রে বাণিজ্যেও অপার সম্ভাবনা

Printed Edition
back-3
সমুদ্রে বাণিজ্যেও অপার সম্ভাবনা

এস এম মিন্টু সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে

  • বিশ্ব বাণিজ্যের ৯০ ভাগই সম্পন্ন হয় সামুদ্রিক পরিবহনের মাধ্যমে
  • সার্বক্ষণিক নজরদারিতে দস্যুরা অপতৎপরতা চালাতে পারে না : ক্যাপ্টেন আরিফ

চার পাশে বিস্তৃত নীল জলরাশি। মৃদু ঢেউয়ের ওঠানামায় সাগরের বুকে দুলছে মাছ ধরার ট্রলার। দূরে চোখে পড়ে দেশী-বিদেশী পণ্যবাহী জাহাজ। এই বিশাল জলরাশির বুকেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অপার সমুদ্রসম্পদ; যা পরিচিত ‘নীল অর্থনীতি’ বা ব্লু ইকোনমি নামে। উপকূল থেকে গভীর সমুদ্র পর্যন্ত এই সম্পদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

নীল অর্থনীতির ধারণার প্রবর্তন করেন বেলজিয়ামের অর্থনীতিবিদ গুন্টার পাওলি, ১৯৯৪ সালে। সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতিকেই বলা হয় নীল অর্থনীতি। সমুদ্রের জলরাশি ও তলদেশে থাকা বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে যে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সেটিই এর মূল বিষয়। সমুদ্র থেকে আহরণ করা যেকোনো সম্পদ যখন জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হয়, তখন তা নীল অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত হয়।

জাতিসঙ্ঘের ব্যাখ্যায়, ব্লু ইকোনমি হলো মহাসাগর, সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলের সাথে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বিস্তৃত পরিসর। এর লক্ষ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি, সামাজিক পুঁজি গড়ে তোলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ’ দিয়ে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন এলাকায় টহল চলাকালে এমনই চিত্র দেখা যায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতির জোনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। সরাসরি টহল, রাডার সিস্টেম ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই বিশাল জলরাশি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। উদ্দেশ্য- দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষা ও নীল অর্থনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আরো ত্বরান্বিত হয়। এ লক্ষ্যে নৌবাহিনীর সক্ষমতা ও সমুদ্রভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

গভীর সমুদ্রে টহলকালে নৌবাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হয়। তারা নয়া দিগন্তকে জানান, সাগরপথে অবৈধ পণ্য পরিবহন, মানবপাচার, মাদক চোরাচালান ও বিদেশীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নৌবাহিনী নিয়মিত টহল ও নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। ‘সি লাইন অব কমিউনিকেশনস’ সুরক্ষা, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখাও নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাশাপাশি ইলিশসহ সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং নিষিদ্ধ সময়ে মাছ আহরণ বন্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া হচ্ছে।

সরেজমিন বঙ্গোপসাগর

টানা দুই দিন উপকূল ও গভীর সমুদ্রে অবস্থানকালে দেখা যায়, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, মহেশখালী ও শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ টহলে রয়েছে। শীতকাল হওয়ায় সাগরের অধিকাংশ অংশ ছিল শান্ত। পানির রঙ নীল-সবুজ ও স্বচ্ছ। সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে নৌবাহিনীর দু’টি ও কোস্টগার্ডের দু’টি জাহাজ নোঙর অবস্থায় দেখা যায়। শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্টমার্টিন যাত্রাপথে মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় নৌবাহিনীর টহল ছিল চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে মাছ ধরার ট্রলারের উপস্থিতিও লক্ষ করা যায়।

এ ছাড়া যেখানে সাধারণ দৃষ্টির বাইরে, সেই গভীর সমুদ্রেও নৌবাহিনীর টহল জোরদার। মাঝে মধ্যে দ্রুতগামী স্পিডবোট ও মেরিটাইম পেট্রোল এয়ারক্রাফটের (এমপিএ) নজরদারিও দেখা গেছে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটন মৌসুমে বিকল্প আয় থাকলেও বছরের বড় সময় মাছ ধরেই জীবিকা চলে। এ সময়ে উপকূল ও গভীর সাগরে তাদের প্রধান ভরসা নৌবাহিনী। জেলেদের নিরাপত্তা, ট্রলার ও নৌযানের সুরক্ষায় নৌবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তারা।

নীল অর্থনীতির নিরাপত্তায় নৌবাহিনী

গভীর সমুদ্রে টহলকালে ‘বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ’-এর অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আরিফ, নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার জাহিদ, গ্যানারি অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোস্তাফিজ ও নেভিগেটিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সামিনের সাথে দেখা হয়।

ক্যাপ্টেন আরিফ বলেন, ‘সমুদ্র ও উপকূলীয় নিরাপত্তাসহ বাংলাদেশ নৌবাহিনী নীল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্টেকহোল্ডার। এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থা, শিল্পকারখানা ও বন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই নৌবাহিনীর মূল দায়িত্ব। বিনিয়োগকারীদের আস্থা দিতে ২৪ ঘণ্টা সমুদ্রে নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন থাকে।’ তিনি আরো বলেন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষায় ‘সি লাইন অব কমিউনিকেশনস’ নিরাপদ রাখা হচ্ছে। নিয়মিত টহলের কারণে জলদস্যুরা বড় ধরনের অপতৎপরতা চালাতে পারে না।

সার্ভে ও পরিকল্পনায় গুরুত্ব

সরকারি এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ বাংলাদেশকে জ্বালানি নিরাপত্তা দেয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রফতানির মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে মাছ আহরণ বহুগুণ বাড়ানো যাবে। গভীর সমুদ্রে টুনা ও টুনা জাতীয় মাছের বড় মজুদ রয়েছে। সামুদ্রিক জীব থেকে প্রসাধনী, পুষ্টি, খাদ্য ও ওষুধ উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

এ ছাড়া অফশোর অঞ্চলে উচ্চগতির বাতাস কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন এবং ক্রুজ শিপ ও দ্বীপভিত্তিক পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে এ খাতকে আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত করা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু হেনা মুহাম্মদ ইউসুফ বলেন, বঙ্গোপসাগরের আয়তন প্রায় এক লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার; যার বড় অংশ এখনো ব্যবহারের বাইরে। এতে বিপুল মৎস্য ও খনিজসম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন বন্দর ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুললে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত গবেষণা, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

তিনি আরো বলেন, সমুদ্র নিরাপত্তা, গবেষণা ও সার্ভে কার্যক্রমে নৌবাহিনীকে আরো সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক উদাহরণ অনুসরণ করে নৌবাহিনী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে নীল অর্থনীতির মাধ্যমেই দেশের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দেয়া সম্ভব।

বিশ্বে নীল অর্থনীতির চিত্র

বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই সামুদ্রিক পরিবহনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, চীনসহ অনেক দেশ নীল অর্থনীতিকে উন্নয়নের মূল কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে। অস্ট্রেলিয়া ২০১৫-২৫ সালকে ব্লু ইকোনমি দশক ঘোষণা করেছে। চীনের জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি আসে সমুদ্রকেন্দ্রিক শিল্প থেকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা ও সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে নীল অর্থনীতিই হতে পারে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এ জন্য নৌবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সক্ষমতা আরো বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।