আলকাছ মাঝির ভাইয়ের জবানবন্দী

নদীতে হাত-চোখ বাঁধা বন্দীদের গুলি করতেন জিয়া স্যার, লাশ ডুবানো হতো বস্তা বেঁধে

আলমগীর কবির
Printed Edition
  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

রাতের নিস্তব্ধতা চিরে যখন বলেশ্বরের শান্ত জলে আছড়ে পড়ত ট্রলারের ইঞ্জিন-চালিত ঢেউ, সেই অন্ধকারের আড়ালেই লেখা হতো একেকটি মানুষের শেষ পরিণতি। যে নদী জীবন ও জীবিকার রসদ জোগাত উপকূলের জেলেদের, সেই নদীকেই সাক্ষী বানিয়ে একের পর এক তাজা প্রাণ নিমজ্জিত করা হতো তলদেশে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথাকথিত ‘অভিযানের’ নামে।

গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের এমনই এক ভয়াল অধ্যায়ের রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী ট্রলার মাঝি মো: আব্বাস মল্লিক (৬০)। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও র‌্যাবের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দশম সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দী দেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এই সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। জবানবন্দী শেষে কাঠগড়ায় উপস্থিত আসামি জিয়াউল আহসানকে সরাসরি শনাক্ত করে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন আব্বাস মল্লিক। জবানবন্দী গ্রহণ শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও সাহিদুর রহমান সাক্ষীকে জেরা করেন। জেরা সম্পন্ন হলে পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।

এ দিন প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও তাসমিরুল ইসলাম। তাদের সাথে বেঞ্চে উপস্থিত ছিলেন- প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, শাইখ মাহদী, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, মঈনুল করিম ও অলি মিয়াসহ অন্য সদস্যরা।

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চর দুয়ানী গ্রামের বাসিন্দা আব্বাস মল্লিক ট্রাইব্যুনালকে জানান, ২০১০ সালের দিকে র‌্যাব সদস্যরা স্থানীয় মাছ ধরার ট্রলার মালিকদের ডেকে তাদের বোট অভিযানে ব্যবহারের জন্য বাধ্য করত। সঙ্কেত পাওয়া দিনগুলোতে সন্ধ্যায় স্থানীয় বরফ কল ও আশপাশের দোকানপাট বন্ধ রেখে বাতি নিভিয়ে রাখার নির্দেশ দেয়া হতো। এরপর রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে ঢাকা থেকে হাত ও চোখ বাঁধা বন্দিদের চার-পাঁচটি মাইক্রোবাসে করে এনে বরফ মিলের ঘাটে ভেড়ানো হতো।

সাক্ষী জানান, বন্দীদের বোটে তোলার পরপরই ভারী সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা তুলে নিয়ে বলেশ্বর নদীর গভীর সাগরের দিকে বোট চালাতে বলা হতো। গভীর পানিতে পৌঁছানোর পর ট্রলারের গতি কমিয়ে হাত-চোখ বাঁধা বন্দীদের বের করা হতো। র‌্যাবের দু’জন সদস্য শক্ত করে বন্দীকে চেপে ধরে রাখতেন, আর কর্মকর্তা ‘জিয়া স্যার’ নিজস্ব অস্ত্র দিয়ে ওই বন্দীর মাথা, কান বা বুকে গুলি চালিয়ে হত্যা করতেন।

জবানবন্দীতে আব্বাস মল্লিক আরো জানান, গুলির পর লাশ যেন পানিতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হতো। একই সাথে লাশের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি ও মগজ বের করে দেয়া হতো, যাতে লাশ দ্রুত পানিতে তলিয়ে যায়। রক্তে ভেসে যাওয়া ট্রলারটি পরবর্তী সময়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হতো মাঝিদের। কিছু বন্দীকে সুন্দরবনে নিয়ে তথাকথিত ‘গোলাগুলির নাটক’ সাজিয়ে হত্যা করে সাংবাদিকদের খবর দেয়া হতো। গোপনীয়তা রক্ষার বিনিময়ে মাঝিদের খামে করে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করতেন আসামি জিয়াউল আহসান।

সাক্ষীর ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকও র‌্যাবের কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ট্রলারের মালিক ছিলেন। তবে বাহিনীর এসব নির্মম কর্মকাণ্ড নিয়ে বাজারে মুখ খোলায় তার ওপর ক্ষিপ্ত হয় র‌্যাব। ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘জিয়া স্যার’-এর নাম ভাঙিয়ে ফোন করে আলকাছকে বটতলা মানিকখালী এলাকায় ডাকা হয়। সে দিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে আলকাছ নিখোঁজ হন। পরে বিভিন্ন র‌্যাব কার্যালয়ে ঘুরেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পর পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলেও অভিযুক্ত র‌্যাব কর্মকর্তা ও বাহিনীর নাম লিখতে অস্বীকৃতি জানায় পুলিশ। অনেক বছর পর ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আসামি জিয়াউল আহসানের দিকে ইঙ্গিত করে আব্বাস মল্লিক বিচারকের উদ্দেশে আকুতি জানান, ‘আমি আমার ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজের জন্য জিয়া স্যারের বিচার চাই। আমি ওই সময় জিয়া স্যারকে দেখেছি, তিনি আজ কোর্টে উপস্থিত আছেন।’

মনে হয় আমি সবার টার্গেট : ট্রাইব্যুনালকে জিয়াউল

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনার সময় হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও গায়ে ভেস্ট পরানো থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান। তিনি বলেন, মনে হয় আমি সবার টার্গেট। আমি ট্রাইব্যুনালের কাছে সুবিচার চাই।

গতকাল মামলার জবানবন্দী ও জেরার শেষপর্যায়ে এজলাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কিছু কথা বলার সুযোগ চান জিয়াউল আহসান।

অনুমতি দিলে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মাননীয় আদালত, সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন প্রশিক্ষণের সময় আমি কোমর ও ঘাড়ে ব্যথা পাই; কিন্তু ইদানীং কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার সময় আমার হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুকে ভেস্ট বা জ্যাকেট পরানো হয়। আমি এটা থেকে অব্যাহতি চাই। তবে মনে হয় আমি সবার টার্গেট। আমি সুবিচার চাই।’

এ নিয়ে প্রসিকিউশনের মতামত জানতে চান ট্রাইব্যুনাল। তখন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, এটা পুরোপুরি জেল কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার। যদি তার প্রতি আচরণের কোনো ব্যত্যয় ঘটে থাকে বা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেআইনি কিছু করে, তাহলে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারবেন। তবে আমার মনে হয় নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে এভাবে আনা হচ্ছে।

এ সময় জিয়াউলের উদ্দেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, প্রসিকিউশন বলছে আপনাকে নিরাপত্তা দেয়ার স্বার্থেই এ ব্যবস্থা। জবাবে জিয়াউল আহসান বলেন, প্রিজন ভ্যান থেকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানার দূরত্ব মাত্র পাঁচ গজ। এ ছাড়া গাড়ি থেকে নামানোর সময় ২০ জন পুলিশ সদস্য থাকেন।

তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, পাঁচ গজ নয়, এক গজ থেকেও কেউ চাইলে স্নাইপারে টার্গেট করতে পারেন। জিয়াউল জবাব দেন, এখানে টার্গেট নেয়ার কোনো দিক নেই। ট্রাইব্যুনালে অনেক বেশি নিরাপত্তা। চাইলেই কেউ টার্গেট করতে পারবেন না। অতএব আমি এ থেকে অব্যাহতি চাই। পরে হাতকড়া ও ভেস্ট থেকে অব্যাহতির জন্য জিয়াউল আহসানকে একটি আবেদন করার পরামর্শ দেন বিচারক মোহিতুল হক।

এ প্রসঙ্গে জিয়াউল আহসানের আরেক আইনজীবী নাজনীন নাহার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা অবশ্যই আবেদন করব; কিন্তু প্রসিকিউশন কী চায়, সেটিই দেখার বিষয়। এখানে তারা যা চায় তা-ই হয়।